• সোমবার   ১৪ জুন ২০২১ ||

  • জ্যৈষ্ঠ ৩১ ১৪২৮

  • || ০৪ জ্বিলকদ ১৪৪২

দৈনিক গোপালগঞ্জ

গোপালগঞ্জ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে কামার শিল্প

দৈনিক গোপালগঞ্জ

প্রকাশিত: ৬ মে ২০২১  

‘সোনারুর টুকুর টুকুর, কামারের এক ঘা’ প্রচলিত প্রবাদটি এখন আর শোনা যায় না। সময় বদলেছে কামার শিল্প এখন বিলুপ্তির পথে। বংশ পরম্পরায় চলে আসা এক সময়ের ঐতিহ্য এখন হারিয়ে যাচ্ছে। হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার এ পেশাকে ধরে রেখে জীবিকা নির্বাহ করছেন। কিন্তু এক সময় এখানকার কামার শিল্পের সুখ্যাতি ছিল দেশজুড়ে। নানা সমস্যা ও সীমাবদ্ধতায় অনেকেই পেশা বদল করেছেন। পেশাজীবীরা কোন সরকারি সহায়তা না পেলেও শিল্পটিকে ধরে রাখতে সরকারিভাবে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বললেন তারা।

একসময় টুং-টাং আর টিক-টক শব্দে মুখরিত থাকতো গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের প্রভাকরদী কামার পাড়া। দা, বটি, ছুরি, কাস্তেসহ গৃহস্থালীর নানা উপকরণ তৈরিতে একসময় দিনরাত ব্যস্ত থাকতো কামার সম্প্রদায়। উপজেলার গণ্ডি পেরিয়ে এসব উপকরণ সরবরাহ করা হতো দেশের বিভিন্ন জেলায়। কিন্তু নানা সমস্যায় জর্জরিত শিল্পটি এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে।

কয়লা, লোহাসহ কাঁচামাল উপকরণের উচ্চ মূল্য এবং পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অনেকেই পেশা বদল করেছেন। যেখানে ১৮’শ সালের শুরুর দিকে প্রভাকরদীর এই কামার পাড়ার যাত্রা শুরু হয়ে ১৯ শতাব্দির শেষে পর্যন্ত প্রায় ৩’শ কামার এই পেশার সাথে জড়িত ছিলো। বর্তমানে হাতে গোনা কয়েকটি পারিবার বংশের ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন তার মধ্যে মাত্র ১৫ থেকে ২০ জন এই পেশায় নিয়োজিত আছে। হাপর চালিয়ে হাতুড়ি পেটানো শব্দে তেমন মুখর নেই প্রভারকরদীর কামারপাড়া। আগেরমত সেই লোহা পুড়িয়ে লাল করে পিটিয়ে দিনরাত ধারালো দা, বটি, ছুরি, চাপাতি তৈরিতে কোন ব্যস্ততাও নেই কারিগরদের।

এদিকে, মহামারি করোনা ভাইরাসের কারণে তেমন বেচাকেনা না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন ব্যসায়ীরা। প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব আর আধুনিক সব জিনিসপত্র পাওয়ার আশায় এ পাড়ায় কামার শিল্প প্রায় বিলুপ্তির পথে। ফলে মুকসুদপুর উপজেলার একমাত্র কামারশিল্প খ্যাত অনেক কামাররা বিভিন্ন পেশায় জড়িয়ে গেছে। পূর্বপুরুষদের পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে তারা। তবে কিছু লোকজন এখনও ওই কামার শিল্পে জড়িত রয়েছে। এখানকার কামাররা সাধারণত মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় দা-বটি, কাস্তে, লাঙ্গলের ফলা, কোদাল, নাইংল্যা, সাবল, খুন্তা, কোরাল, ট্যাঙ্গি, তারকাঁটা সহ বিভিন্ন প্রকার লোহার হাতিয়ার তৈরী করে হাট-বাজারে বিক্রি করে থাকে। তবে বর্তমান আধুনিক যুগের অত্যাধুনিক সব যন্ত্রপাতি আবিষ্কারের ফলে হাতের তৈরী লোহার জিনিস পত্র মানুষ এখন আর বেশি ব্যবহার করছে না। বাজারে বিভিন্ন ধরনের ধাতব দ্রব্যের তৈরি আধুনিক উপকরণ পাওয়ার কারণেই লোহার উপকরণের প্রতি মানুষের তেমন আগ্রহ নেই।

প্রভাকরদীর কামার পাড়ার ৭৫ বছর বয়সের কামার প্রাণবল্লভ  জানান, আমার ঠাকুর দা বিপিন কর্মকার ১৮’শ শতাব্দির শেষের দিকে তার জন্মের পর থেকে এই কামার পেশার সাথে জড়িত হন। তার মৃত্যুর পরে এই কাজ দেখাশোনা করতেন আমার পিতা সূর্য্য কর্মকার।  পিতার মৃত্যুর সময় আমি খুব ছোট ছিলাম। সংসারের টানাপোড়নের কারনে পড়াশোনা বাদ দিয়ে ছোট বয়সেই বড় ভাই নারান কর্মকারের সাথে কামার পেশায় যুক্ত হই। পরবর্তীতে প্রায় ৭০ বছর ধরে এই কামার পেশার সাথে জড়িত আছি। আমার বয়স হয়েগেছে তাই আর এই কাজ এখন করতে পারি না। বয়সের ভারে এখন কোন কাজই করতে পারি না কিন্তু সরকারের অনুদান তো দূরের কথা এখন পর্যন্ত কোন বয়স্ক ভাতাও পাইনি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধির কাছ গেলে তিনি শুধু আশ্বস্তই করে যান কিন্তু আমার বয়স্ক ভাতা আর হয় না। আমাদের তৈরী লোহার জিনিসপত্রের চাহিদা আগের তুলনায় অনেকাংশে কমে গেছে। ফলে কামার শিল্পের সাথে জড়িতদের সংখ্যা দিনদিন কমে যাচ্ছে। অনেকেই এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশা ধরেছেন। আবার অনেকে তার বাপ দাদার পেশা ছাড়তে পারছেন না। একরকম কোন উপায় না পেয়েই তারা তাদের পৈত্রিক এ পেশাকে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। আমার তিন ছেলের মধ্যে দুই ছেলে সোনার কারখানায় কাজ করে, ছোট ছেলে নন্দু এই কামার পেশার সাথে জড়িত আছে। এই পেশায় থেকে কোন রকম দিন পার করছে তারা। তবে সরকার এ শিল্পে কিছুটা সহায়তা করলে অনেকেই পেশাটি ধরে রাখবেন আর পুনরায় অন্যারাও এ পেশায় ফিরে আসা সম্ভব হবে বলে মনে করি।

কামার পাড়ার ৬৫ বছর বয়সী আরেক কামার শিবু কর্মকার জানান, আমার ঠাকুর দা রাজেন্দ্রনাথ কর্মকার ১০৫ বছর বয়সে মারা যান। তিনি প্রায় ৯৫ বছর এই পেশার সাথে জড়িত ছিলেন। আমার পিতা মধুসুদন কর্মকার প্রায় ৬০ বছর এই পেশার সাথে জড়িত ছিলেন। আমি আর আমার ছোট ভাই পরিমল বংশপরম্পরায় এই পেশার ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে কাজ করে যাচ্ছি। একসময় কাজের চাপ এত বেশি ছিলো আমাদের কাছে আসা খরিদারদের রাতের খাবার খাইয়ে আমাদের বাড়িতেই তাদের রাখতাম। সারারাত কাজ করে সকালে তাদের মাল ডেলিভারি দিতাম। বাড়িতে সব সময় খরিদ্দারের উপচোপড়া ভিড় ছিলো। বিশেষ করে খেজুর রসের মৌশুমে এবং তালরশের মৌশুমে কামার পাড়ায় প্রায় ২০ হাজার গাছ গাটার ছ্যানের অর্ডার থাকতো। দিন-রাত কাজ করে কাষ্টমারের মাল বানিয়ে দিতাম। ধান-পাটের মৌশুমে কাস্তে আর কোদালের চাপও থাকতো চোখে পড়ার মতো। পিয়াজের সময় লাঙ্গল, নাইংল্যাসহ বিভিন্ন কৃষি সরঞ্জামাদিরও প্রচুর চাপ থাকতো। আমাদের সাথে আমাদের বাড়িও মহিলারাও দিন-রাত কাজ করেছে। আমার একই বাড়িতে বসবাসকারী মনোরঞ্জন কর্মকার তার কাজের ঘুন্টিঘর থাকলেও তিনি আর এই পেশার সাথে নেই। তিনি দীর্ঘদিন পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। 

কামার শিল্পের দৈন্যদশা সম্পর্কে তিনি আরও জানান “পুঁজির অভাব, লোহা কয়লার দাম বেশি হওয়ায় মজুরির দাম উঠছে না। তাছাড়া বেচা-বিক্রি কম। তাই অনেকেই এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় যোগ দিয়েছে। আমি পৈত্রিক পেশা বলে ছাড়তে পারছি না। আঁকড়ে ধরে আছি। সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা পেলে অনেকে এ পেশার মাধ্যমে সচ্ছল জীবন যাপন করতে পারতো। অপরদিকে কামার শিল্প ফিরে পেতো তার হারানো ঐতিহ্য।

কামার পাড়ার রবিন্দ্রনাথ কর্মকার, মাখন, নিলু ও  জীবন কর্মকার, জানান, আমাদের এখানে আগে প্রায় ৫০টি ঘর ছিলো যারা এই কামার শিল্পের সাথে জড়িত ছিলো এখন মাত্র ৮টি ঘর এই শিল্পের সাথে জড়িত আছে। তবে এই পেশার যে দৈন্যদশা তাতে এই সংখ্যা অচিরেই কমে যাবে। আমাদের মধ্যে অনেকেই এখন বিভিন্ন পেশার সাথে জড়িয়ে গেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে অর্থাভাবে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন তারা। সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং শিল্পকে টিকিয়ে  রাখতে সরকারি সহায়তার কথা বললেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি। দেশীয় ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে এখনি কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে এমন প্রত্যাশা সবার।

দৈনিক গোপালগঞ্জ
দৈনিক গোপালগঞ্জ