• বৃহস্পতিবার   ০৪ জুন ২০২০ ||

  • জ্যৈষ্ঠ ২১ ১৪২৭

  • || ১৩ শাওয়াল ১৪৪১

দৈনিক গোপালগঞ্জ
৪৯৩

তিস্তা নদী পানিশূন্য!

দৈনিক গোপালগঞ্জ

প্রকাশিত: ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯  

তিস্তা নদীর উজানে ভারত গজল ডোবার বাঁধ নির্মাণ করায় এবং পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে না পারায় ধীরে ধীরে তিস্তা নদী পানিশূন্য কংকালসার নদীতে পরিণত হয়েছে। ফলে তিস্তা নদীতে বর্ষা মৌসুমে পানির দেখা মিললেও শুকনো মৌসুমে থাকে হাঁটু পানি আর কেবল ধূ-ধূ বালুচর।

‘তিস্তা নদীর কতা কী আর কমো বাহে, কয়মাস আগেও তিস্তা হামার বাড়িঘর ভাঙ্গিল, বর্ষাকালে তিস্তার ঢেউয়ের পানিত হামার কইলজ্যাত পানি থাকে নাই আর এলা সেই তিস্তার নিজেরেই বুকোত পানি নাই, চাইরোপাকে খালি ধ্বস-ধ্বসা বালা আর বালা (বালু), তোমরায় দেখো উজান-ভাটি শুধু চর আর চর, পুলের গোরত (ব্রিজের নিচে) অল্প একনা ঘোলা পানি, মাছের তো দেখা সাক্ষাৎ নাই, তিস্তা দেখিয়া এলা মনে হয় তিস্তা এলা একনা মরা নদী।’ আঞ্চলিক ভাষায় কথাগুলো বললেন রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার পাঞ্জরভাঙ্গা গ্রামের জাহেদুল ইসলাম ও নিজপাড়া গ্রামের আব্দুল আউয়াল।

নদী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ‘প্রমত্তা তিস্তানদী’ পানির অভাবে জীর্ণদশায় ভুগছে। যা বিশ্বাসযোগ্য নয়। ভারত গজল ডোবার বাঁধ নির্মাণ তিস্তা নদীর উজানে করায় এবং পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে ব্যর্থ হওয়ায় ধীরে ধীরে তিস্তা নদী পানিশূন্য কংকালসারে পরিণত হয়েছে। ফলে তিস্তা নদীতে বর্ষা মৌসুমে পানির দেখা মিললেও শুকনো মৌসুমে থাকে হাঁটু পানি আর কেবল ধূ-ধূ বালুচর।

ভারতের গজল ডোবার দো-মোহনী থেকে শুরু হয়ে বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার সীমান্তের ঝড় সিংহেশ্বর দিয়ে প্রবেশ করেছে বাংলা দেশের অন্যতম প্রধান নদী তিস্তা। দেশের উত্তরের জেলা নীলফামারী, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার বুক চিরে এঁকে বেঁকে চলা তিস্তা নদীর বিসর্জন হয়েছে ব্রক্ষপুত্র নদে। তিস্তার এই প্রবাহ ধারা বাংলাদেশে বিস্তৃত রয়েছে ১শ ১৫ কিলোমিটার।

বিশাল এ তিস্তা নদীর শাখা নদীও রয়েছে অনেক। তারমধ্যে করতোয়া, মরাস্বতী, ছোট তিস্তা, বুড়ি তিস্তা। এখন এ নদীগুলোও পানিশূন্য। কিন্তু তিস্তা নদী বর্ষায় সর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করে।এলোমেলোভাবে ভাঙ্গতে থাকে বসত ভিটা, ফসলী জমি। এর থেকে পরিত্রাণ পায় না রংপুর বিভাগের ৫ জেলার লাখো তিস্তা পাড়ের মানুষ।

এ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য বাংলাদেশ সরকার ২০০৭ সালে সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ-ভারত তিস্তা পানি চুক্তিতে বসে সিদ্ধান্ত হয় তিস্তার পানি ৩৬ শতাংশ পাবে বাংলাদেশ আর ৩৯ শতাংশ পাবে ভারত। বাবি ২০ শতাংশ পানি নদী সংরক্ষণের জন্য রাখা হবে। কিন্তু পরবর্তীতে ভারত গজল ডোবায় বাঁধ নির্মান করে পানি প্রবাহ প্রতিরোধ করছে।

তিস্তার তলদেশে অজস্র পাথর, নুড়ি, বালি আর পলি পড়ে ভরাট হয়ে যায়। এ কারণে বর্ষা মৌসুমে তিস্তার পানি আছড়ে পড়ে নদীর দুই ধারে। যার কারণে প্রতিবছর অন্তত ২০ হাজার মানুষ হয় গৃহহারা, গাছপালা, আবাদী জমি হারিয়ে অনেকে হয়ে যায় পথের ভিখারি।

এছাড়া বর্ষা মৌসুমে ভারত অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেওয়ায় নদীর দুইপাড়ের মানুষের জমি, ঘরবাড়ি ডুবে সর্বশান্ত করে দেয়। বর্ষায় তিস্তা নদীর কড়াল গ্রাস আর খরা মৌসুমে পানির অভাবে ইরি বোরোসহ অন্য ফসলের চাষাবাদ করতে পারে না কৃষকরা।

দুই যুগ আগেও এ নদী ধরে সারি সারি নৌকা মালপত্র বোঝাই করে পাল তুলে দেশের বিভিন্ন জায়গায় যেত ব্যাবসা বাণিজ্য করতে। বর্তমানে সেগুলো গল্প কাহিনী। নৌ যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং নদীতে পানি শূন্যতার কারণে মাছ না থাকায় কর্মহীন হয়ে পড়েছে কয়েক হাজার স্থানীয় জেলে পরিবার। এছাড়া সরকারের নদী শাসনের পরিকল্পিত পরিকল্পনার অভাবে নদীর মাঝখান উঁচু হয়ে পানি দুই পাড়ে প্রবাহিত হয়। এদিকে নদীর ড্রেজিংয়ের কাজ কি তা এই এলাকার মানুষ জানে না। অথচ নদী ড্রেজিং করে নদীর পানির গতিপথ সচল করলে একদিকে যেমন নদী ভাঙ্গন কমে যাবে অন্যদিকে কৃষক নদীর পানি দিয়ে সেচ কাজ চালাতে পারবে।

এর ফলে যেমন বিদ্যুৎ খরচ কমে যাবে অপরদিকে কৃষি উৎপাদন ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাবে।সরকার তিস্তা নদী জরুরী ভিত্তিতে ড্রেজিং করে কৃষি নির্ভর রংপুর বিভাগের ৫ জেলার কোটি মানুষের কৃষি আর মৎস্য ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করবে। এটি এখন সাধারণ মানুষের সময়ের দাবি।

এ ব্যাপারে রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রোকৌশলী মোঃ মেহেদী হাসান ইত্তেফাককে জানান, ‘দেশের নদ-নদী গুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়সহ নদীতে পানি প্রবাহের দেখভাল করে বাংলাদেশ জয়েন্ট রিভার কমিশন। নদীতে পানি প্রবাহের তদারকি আমাদের কাজ নয়।তিস্তা নদীর এ দশার কথা নতুন নয়। ভারত ন্যায্য পানি না দেওয়ার কারণে আজ এমন অবস্থা।

দৈনিক গোপালগঞ্জ
দৈনিক গোপালগঞ্জ