• বৃহস্পতিবার   ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ||

  • ফাল্গুন ১৩ ১৪২৭

  • || ১৩ রজব ১৪৪২

দৈনিক গোপালগঞ্জ

নামাজে মোবাইল বেজে উঠলে করণীয়

দৈনিক গোপালগঞ্জ

প্রকাশিত: ২৬ জানুয়ারি ২০২১  

নামাজ ভঙ্গের যেসব কারণ আছে তন্মধ্যে একটি হলো- আমলে কাসীর। আমলে কাসীর বলা হয়, নামাজি ব্যক্তির এমন কোনো কাজে লিপ্ত হয়ে যাওয়া যা অন্য কেউ দেখলে মনে করবে সে নামাজে নেই। তবে নামাজের মধ্যে কারো মোবাইলের রিং বেজে উঠলে নামাজ ভেঙে যাবে কিনা। তা নিয়ে অনেককেই দুশ্চিন্তা করতে দেখা যায়। 

অনেকেই জানতে চান, মসজিদে প্রবেশের আগেই মোবাইলের রিং বন্ধ করে দেয়া জরুরি কি না? যদি কেউ রিং বন্ধ করে দিয়ে শুধু ভাইব্রেশন দিয়ে রাখে তাতে কোনো ক্ষতি আছে কি না?

এ ক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, ‘নামাজ’ অন্য সকল ইবাদত থেকে ভিন্ন ধরণের ইবাদত। এ ইবাদতটি হল সরাসরি আল্লাহ তায়ালার দরবারে হাজিরা দিয়ে তাঁর মহান স্বত্ত্বার সামনে দন্ডায়মান হয়ে তাঁর সঙ্গে কথোপকথনের এক অপূর্ব মুহূর্ত। এ কারণেই নামাজ অবস্থায় একাগ্রতা ও খুশুখুযুর প্রতি যেভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, অন্য কোনো ইবাদতের বেলায় তেমনটি করা হয়নি। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- ‘ঐ সকল মুমিন সফলকাম, যারা নিজেদের নামাজে বিনয়-নম্র। (সূরা মুমিনুন ১-২)

তাই মসজিদে প্রবেশের আগেই মোবাইল একেবারে বন্ধ না করলেও অন্তত রিংটোন বন্ধ করে দেয়া আবশ্যক। কারণ, মসজিদে রিং বেজে উঠলে নামাজিদের খুশুখুযু নষ্ট হয় প্রবলভাবে। আর নামাজের উদ্দেশ্যে প্রবেশকারীর জন্য মোবাইলে ভাইব্রেশন দিয়ে রাখা ঠিক নয়। কারণ, ভাইব্রেশন দিয়ে রাখলেও কল আসলে নামাজির মনোনিবেশ নষ্ট করে। এতে অন্যের নামাজের ক্ষতি না হলেও নিজের নামাজের খুশুখুযু নষ্ট হয় বটে।

তাছাড়া মোবাইলটি তখন পার্শ্ববর্তী মুসল্লীর শরীরে স্পর্শ করলে তারও নামাজের একাগ্রতা নষ্ট হবে। তাই ভাইব্রেশন দিয়ে রাখাও ঠিক নয়, বরং হয়ত সাইলেন্ট করে রাখবে, কিংবা একেবারে বন্ধ করে দিবে।

কোনো কারণে যদি নামাজের আগে মোবাইলের রিং বন্ধ করা না হয় আর নামাজ পড়াবস্থায় রিং বেজে উঠে তখন করণীয় কি? নামাজে থেকে রিং বন্ধ করে দেয়ার কোনো ব্যবস্থা আছে কি না? কিভাবে বন্ধ করলে নামাজ ভাঙ্গবে না। নামাজ নষ্ট না করে রিং বন্ধ করার কোনো সুযোগ আছে কিনা , এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা থাকলে আমাদের জন্য আমল করতে সুবিধা হবে।

জামাত চলাকালীন মুসল্লীর মোবাইল বেজে ওঠলে করণীয় ও লক্ষণীয় বিষয়সমূহ হলো নিম্নরূপ :

এক হাত দ্বারা রিং বন্ধ করা

দুই হাত ব্যবহার না করে নামাজের আপন অবস্থাতে থেকেই এক হাতের সাহায্যে মোবাইল পকেটে রেখেই কোনো বাটন চেপে রিং বন্ধ করে দিবে। আর পকেট থেকে বের করার প্রয়োজন হলেও এক হাত দ্বারাই করবে। মোবাইল বের করে পকেটের কাছে রেখেই না দেখে দ্রুত বন্ধ করে পকেটে রেখে দিবে। 

জেনে রাখা প্রয়োজন যে, নামাজে প্রয়োজনে এক হাত কোনো কাজে ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে। যেমন, টুপি ওঠানোর জন্য, জামার হাতা নামানোর জন্য, সিজদার স্থানের কংকর সরানোর জন্য, শরীরের কোন স্থান বিশেষ প্রয়োজনে চুলকানোর জন্য ইত্যাদি। ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়া ১/৫৬৪, শরহুল মুনিয়াহ ৪৪৩, ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া ১/১০৫,

এক হাত দ্বারা দেখে বন্ধ করা

এক হাত দ্বারা বন্ধ করতে গিয়ে মোবাইল পকেট থেকে বের করে দেখে দেখে বন্ধ করা যাবে না। কারণ, এমনটি (করলে যদিও দুই হাত ব্যবহার হচ্ছে না, কিন্তু মোবাইল দেখে দেখে বন্ধ করা অবস্থায় এ ব্যক্তিকে কেউ দেখলে সে নামাজে আছে বলে মনে করবে না।) আর নামাজ অবস্থায় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে নামাজ ভেঙে যায়। তাই নামাজ অবস্থায় মোবাইল দেখে দেখে বন্ধ করার কোন সুযোগ নেই। রদ্দুল মুহতার ১/২৬৪-২৬৫, আলবাহরুর রায়েক ২/১১-১২

দুই হাত দ্বারা বন্ধ করা

নামাজে মোবাইল বন্ধের জন্য একসঙ্গে দুই হাত ব্যবহার করা যাবে না। যদি এক সঙ্গে দুই হাত ব্যবহার করে তবে নামাজ নষ্ট হয়ে যাবে।

রিং বন্ধের জন্য সিজদা থেকে উঠে গেলে

সিজদাবস্থায় রিং বেজে উঠলে কেউ কেউ সিজদা থেকে প্রায় বসে গিয়ে মোবাইল বের করে বন্ধ করে থাকে। অথচ তখনো ইমাম-মুসল্লী সকলেই সিজদাতেই থাকে। নামাজের এ অবস্থা থেকে মোবাইল বন্ধের জন্য বসে যাওয়া অতঃপর মোবাইল বন্ধ করাতে তিন তাসবীহ পরিমাণ সময় ব্যয় না হলেও নামাজ ভেঙ্গে যাবে। কারণ, যেখানে দুই হাতের ব্যবহারকেই নামাজ ভঙ্গের কারণ বলা হয়েছে সেখানে পুরো শরীরকে নামাজের অবস্থা থেকে সরিয়ে নিয়ে আসা নিঃসন্দেহে নামাজ ভঙ্গের কারণ হবে। এ ছাড়া এ অবস্থায় কোনো আগন্তুক তাকে দেখলে সে নামাজে নেই বলেই মনে করবে। এটিও আমলে কাসীরের অন্তর্ভুক্ত। যা নামাজ নষ্টকারী।

নামাজে একাধিকবার রিং বন্ধ করা

নামাজে একাধিক বার রিং বন্ধ করার পর আবার রিং বেজে উঠলে তা বন্ধ করতে পারবে কি না? এভাবে কতবার পর্যন্ত বন্ধ করার সুযোগ আছে?

এ ক্ষেত্রে সঠিক উত্তর হচ্ছে, তিনবার বিশুদ্ধভাবে ‘সুবহানা রাব্বিয়াল আযীম’ বা ‘সুবহানা রাববিয়াল আলা’ বলা যায় এ পরিমাণ সময়ের ভিতর উপরন্তু দুইবার পর্যন্ত এক হাতের সাহায্যে উপরোক্ত ‘ক’ তে উল্লেখিত নিয়মে রিং বন্ধ করা যাবে। এ সময়ের ভিতর দুইবারের বেশি বন্ধ করা যাবে না। যদি করে তবে নামাজ নষ্ট হয়ে যাবে।

হ্যাঁ, একবার বা দুই বার বন্ধ করার পর তিন তাসবিহ পরিমাণ বিলম্বে আবার রিং বেজে উঠলে তখন বন্ধ করা যাবে। মোটকথা তিন তাসবিহ বলা যায় এ সময়ের ভিতর তিনবার রিং বন্ধের জন্য এক হাতও ব্যবহার করা যাবে না। এতে নামাজ নষ্ট হয়ে যাবে।

-খুলাসাতুল ফাতাওয়া ১/১২৯, রদ্দুল মুহতার ১/৬২৫, আহসানুল ফাতাওয়া ৩/৪১৮-৪১৯

নামাজে দুই হাত ব্যবহারের প্রয়োজন হলে

নামাজে খুশুখুযুর গুরুত্ব অনেক বেশি। কোন নামাজির মল-মূত্রের বেগ হওয়ার দরুণ খুশুখুযু বিঘ্নিত হলে তার জন্য নামাজ ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ফিকহের কিতাবাদিতে এ ক্ষেত্রে নামাজ ছেড়ে দেয়াকে উত্তম বলা হয়েছে। কেউ কেউ ওয়াজিবও বলেছেন। তাহতাবী আলাল মারাকী-১৯৮, হিন্দিয়া ১/১০৭, আল বাহরুল রায়েক ১/২৮৭, রদ্দুল মুহতার ১/৬৫৪, তাহলে নামাজ অবস্থায় মোবাইল বেজে উঠলে যার মোবাইল শুধু তার নামাজেরই বিঘ্ন ঘটায় না বরং আশপাশের মুসল্লীদেরও খুশুখুযু বিঘ্নিত হয়। সুতরাং এক্ষেত্রে নামাজ নষ্ট না করে বন্ধ করা সম্ভব না হলে নামাজ ছেড়ে দিয়ে হলেও মোবাইল বন্ধ করা জায়েয তো বটেই বরং এমনটি করাই কর্তব্য। আর রিংটোন যদি গান বা মিউজিকের হয় তবে এর খারাবিতো আরো অধিক। সুতরাং এক্ষেত্রে নামাজ ছেড়ে দেয়া না জায়েয হওয়া সম্পর্কিত প্রশ্নোক্ত কথাটি ঠিক নয়। সুতরাং এ ধরণের পরিস্থিতিতে নামাজে থেকে উপরোক্ত  নিয়ম অনুযায়ী একহাত দিয়ে বন্ধ করা সম্ভব হলে তাই করবে। কিন্তু তা সম্ভব না হলে নিজের নামাজ ছেড়ে দিয়ে হলেও রিং বন্ধ করে দিবে। অতঃপর মাসবুকের ন্যায় আবার নতুন করে জামাতে শরীক হবে। -রদ্দুল মুহতার ১/৬৫৫

দৈনিক গোপালগঞ্জ
দৈনিক গোপালগঞ্জ