• শনিবার   ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ||

  • ফাল্গুন ১৫ ১৪২৭

  • || ১৫ রজব ১৪৪২

দৈনিক গোপালগঞ্জ

বিখ্যাত কয়েকজন নবী ও তাদের উপর নাজিলকৃত কিতাবের পরিচয়

দৈনিক গোপালগঞ্জ

প্রকাশিত: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২১  

মানব জাতির হেদায়েতের জন্য আল্লাহ তায়ালা অনেক নবী ও রাসুল প্রেরণ করেছিলেন। তাদের অনেকের ঘটনা বিভিন্ন আসমানি গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। অনেকের ঘটনা বর্ণনা করা হয়নি। আল্লাহ তায়ালা এসব ঘটনা বর্ণনা করার উদ্দেশ্য মূলত মানুষকে উপদেশ দান করা। তাই প্রচলিত জীবন চরিত রচনার ন্যায় তিনি তাদের জীবনি আলোচনা করেননি। বরং ঘটনারও ওই অংশই উল্লেখ করেছেন, যা মানুষের উপদেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। 

আসমানি গ্রন্থের সংখ্যা নিয়ে বর্ণনায় ভিন্নতা থাকলেও বিশুদ্ধ বর্ণনা মতে আসমানি গ্রন্থ একশত চারটি। একশটি সফিহা এবং বাকি চারটি কিতাব। কোনো কোনো নবীর উপর পঞ্চাশটি সফিহাও নাজিল হয়েছিল। তাই সকল নবীগণের উপর আসমানি গ্রন্থ নাজিল হয়নি। বরং অধিকাংশ নবী পূর্বের নবীর রেখে যাওয়া কিতাবের অনুস্বরণ করতেন। নিম্নে কয়েকজন নবী, রাসুলের পরিচয় ও তাদের উপর নাজিলকৃত সহিফার সংখ্যা ও কিতাবের নাম তোলে ধরা হলো

হজরত আদম (আ.)
হজরত আদম (আ.) ছিলেন প্রথম মানুষ ও প্রথম নবী। আল কোরআনের পঁচিশ জায়গায় তার আলোচনা এসেছে। তাকে সফিউল্লাহ উপাধি দেয়া হয়েছিল। এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহর পছন্দের ব্যক্তি। তিনি এক হাজার বছর জীবিত ছিলেন। তাঁর উপর দশটি সহিফা নাজিল হয়েছিল। তবে কোন কোন বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় হজরত আদম (আ.) এর উপর কোন সহিফা নাজিল হয়নি। তাঁর স্থলে হজরত মূসা (আ.) এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাঁর উপর দশটি সহিফা নাজিল হয়েছিলো। 

হজরত নূহ (আ.)
তিনি ছিলেন হজরত আদম (আ.) এর পর প্রথম নবী। তিনি রাসুলও ছিলেন। নবী ও রাসুলের মাঝে পার্থক্য হচ্ছে, নবীকে নতুন শরীয়ত দেয়া হতেও পারে আবার নাও দেয়া হতে পারে। আর রাসুল তিনিই হন, যাকে নতুন শরীয়ত দেয়া হয়। তিনি সাড়ে নয়শ বছর জীবিত ছিলেন। আল কোরআনের তেতাল্লিশ জায়গায় তার নাম এসেছে। তিনি বর্তমান জর্দানে এসেছিলেন। তার সময়ে মহাপ্লাবন সংঘটিত হয়।

হজরত ইবরাহিম (আ.)
তিনি হলেন আবুল আম্বীয় অর্থাৎ নবীগণের পিতা। বর্তমান ইরাকের তৎকালিন ব্যাবিলন (বাবেল) শহরে তিনি জন্যগ্রহণ করেন। তার পিতা তারেক ছিল একজন মূর্তিপূজারী। পরবর্তীতে তিনি সেখান থেকে হিজরত করে ফিলিস্তিনে চলে আসেন। সঙ্গে ছিলেন হজরত সারা (আ.) ও ভাতিজা হজরত লূত (আ.)। এখানে আসার পর তার সন্তান ইসহাক (আ.) জন্মগ্রহণ করেন। ইসহাক (আ.) সন্তানগণের দ্বারাই আশপাশে তাওহীদের দাওয়াত পৌঁছে। হজরত ইবরাহিম (আ.) এর উপরও দশটি সহিফা নাজিল হয়েছিল। তিনি ১৯৫ বছর হায়াত পেয়েছিলেন।

হজরত ইসমাইল (আ.)
তিনি হজরত ইবরাহিম (আ.) এর সন্তান। হজরত ইসমাইল (আ.) এর মাতার নাম হাজেরা। হজরত ইবরাহিম (আ.) ইরাক ছেড়ে ফিলিস্তিনে আসার পর হজরত হাজেরার সঙ্গে পরিচয় হয়। তিনি ও তার মা হজরত হাজেরাকে আল্লাহর নির্দেশে জনমানবহীন মক্কায় রেখে আসা হয়। হজরত মুহাম্মাদ (সা.) হজরত ইসমাইল (আ.) এর বংশ থেকেই এসেছিল। তার উপর কোনো সহিফা নাজিল হয়নি। তিনি ১৩৭ বছর হায়াত পেয়েছিলেন।

হজরত লূত (আ.)
তিনি হজরত ইবরাহিম (আ.) এর ভাতিজা। ইরাকের ব্যাবলিন শহরে জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনিও হজরত ইবরাহিম (আ.) এর সঙ্গে হিজরত করে ফিলিস্তিনে চলে আসেন। বর্তমান জর্দানের মৃত সাগর এলাকায় তিনি নবী হিসেবে প্রেরীত হন। ১৭৫ বছর হায়াত পেয়েছিলেন। 

হজরত ইসহাক (আ.)
তিনিও হজরত ইবরাহিম (আ.) এর পুত্র। তার জন্মস্থানও ফিলিস্তিনে। হজরত হাজেরার গর্ভে ইসমাইল আসার পর হজরত ইবরাহিম (আ.) দোয়া করেন। আল্লাহ তায়ালা তাকে শত বছর বয়সে পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দেন। তিনি হচ্ছেন হজরত ইসহাক (আ.)। তার অপর নাম ইসরাইল। বনি ইসরাইলের সকল নবী তার বংশ থেকে এসেছে। মায়ের নাম সারা (আ.)।

হজরত ইয়াকূব (আ.) 
তিনি হজরত ইসহাক (আ.) এর সন্তান। তিনি কেনান বা হেবরন বর্তমান ফিলিস্তিনের একটি এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তার এগারো পুত্র সন্তান ছিলো। ১৮০ বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। 

হজরত শুয়াইব (আ.)
তৎকালিন শামের মাদায়েন অঞ্চলে তিনি নবী হিসেবে প্রেরীত হন। ওই সময় মাদায়েন ব্যবসার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। তিনি মানুষকে ব্যবসায় অসৎ পন্থা অবলম্বন থেকে নিষেধ করেন। জাতি সেটাকে অস্বীকার করার কারণে আল্লাহর পক্ষ থেকে আজাব নাজিল হয়।

মূসা ও হারুন (আ.) 
মিসরে জন্মগ্রহণ করেন। তাদের জাতি বনি ইসরাইলের উপর তৎকালিন ফেরাউন খুব অত্যাচার করতো। তাই তাদেরকে নিয়ে ফিলিস্তিনে চলে আসেন। হজরত মূসা (আ.) ১২০ বছর হায়াত পেয়েছিলেন। হজরত হারুন (আ.) এর কবর মদীনার উহুদ পাহাড়ের নিকটে অবস্থিত। আল্লাহ তায়ালা হজরত মূসা (আ.) এর উপর দশটি সহিফা ও তাওরাত কিতাব নাজিল করেন।

হজরত ইউনুস (আ.)
বর্তমান ইরাকের মছুল শহরে জন্গ্রহণ করেন। তিনি তার গোত্রের মাঝে দাওয়াতের কাজ করেন। কিন্তু দাওয়াত কবুল না করায় তিনি এলাকা ছেড়ে চলে যান। আল্লাহ তায়ালা পরীক্ষা স্বরূপ তাকে মাছের পেটে দেন। মছুল শহরে তার কবরের সন্ধান পাওয়া গেছে।

হজরত দাউদ (আ.) 
জন্মস্থান বেথলেহেম, ইসরাইল। তিনি পিতার সর্বকনিষ্ঠ পুত্র ছিলেন। আল্লাহ তায়ালা জাবুর কিতাব তার উপর নাজিল করেন। তিনি মধুর কন্ঠে জাবুর তেলাওয়াত করতেন। তিনি একশত বছর হায়াত পেয়েছিলেন। তার সন্তান হজরত সুলাইমান (আ.) বিশ্ব শাসন করেছিলেন।

হজরত ইদরিস (আ.)
আল কুরআনে তার আলোচনা দুইবার এসেছে। কারো কারো মতে তিনি হজরত নূহ (আ.) এর দাদা ছিলেন। তার উপর ত্রিশটি সহিফা নাজিল হয়েছিল। 

হজরত শীস (আ.) 
হজরত আদম (আ.) এর সন্তানদের মাঝে সবচেয়ে বেশি পরহেজগার ছিলেন তিনি। এজন্য তিনি তার পিতার প্রিয়তম পুত্র ছিলেন। হাবিলের মৃত্যুর পাঁচ বছর পর তার জন্ম হয়। তার উপর পঞ্চাশটি সহিফা নাজিল হয়।উল্লেখ্য যে, সহিফাগুলোর সংখ্যা উল্লেখ থাকলেও কোন সহিফার নাম কি ছিলো তা উল্লেখ পাওয়া যায় না এবং নাম জানা জরুরীও নয়। বরং আল্লাহর তরফ থেকে কিতাব নাজিল হয়েছিল মৌলিক বিশ্বাস রাখা জরুরী।

হজরত মুহাম্মদ (সা.) 
মুহাম্মাদ (সা.) ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন মক্কায়। পূর্ণ নাম : মুহাম্মাদ ইবনে ʿআবদুল্লাহ ইবনে ʿআবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশিম। তিনি হলেন ইসলামের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব এবং ইসলামী বিশ্বাস মতে আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত সর্বশেষ নবী। যার উপর ইসলামী প্রধান ধর্মগ্রন্থ আল-কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। অমুসলিমদের মতে তিনি ইসলামী জীবন ব্যবস্থার প্রবর্তক। 

অধিকাংশ ইতিহাসবেত্তা ও বিশেষজ্ঞদের মতে, মুহাম্মাদ ছিলেন পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় নেতা। তার এই বিশেষত্বের অন্যতম কারণ হচ্ছে আধ্যাত্মিক ও জাগতিক উভয় জগতেই চূড়ান্ত সফলতা অর্জন। তিনি ধর্মীয় জীবনে যেমন সফল তেমনই রাজনৈতিক জীবনেও। সমগ্র আরব বিশ্বের জাগরণের পথিকৃৎ হিসেবে তিনি অগ্রগণ্য। বিবাদমান আরব জনতাকে একীভূতকরণ তার জীবনের অন্যতম সফলতা। 

দৈনিক গোপালগঞ্জ
দৈনিক গোপালগঞ্জ