• শুক্রবার   ২৯ মে ২০২০ ||

  • জ্যৈষ্ঠ ১৫ ১৪২৭

  • || ০৬ শাওয়াল ১৪৪১

দৈনিক গোপালগঞ্জ
১৪৫

বিনোদন হিসেবে বই পড়া কি হারিয়ে যাবে

দৈনিক গোপালগঞ্জ

প্রকাশিত: ৪ ডিসেম্বর ২০১৯  

আমাদের শৈশবে বিনোদনের উৎস ছিল মূলত দুটি। একটি হলো বাংলাদেশ টেলিভিশন বা বিটিভি আর অন্যটি হলো বই। খেলাধুলা তেমন একটা করতে পারিনি। তখন ছিল বিটিভির স্বর্ণযুগ। একটিমাত্র টিভি চ্যানেল; নারী-পুরুষ, নবীন-প্রবীণনির্বিশেষে সবাই এর দর্শক। সবাই মিলে কী মজা করেই না সেসব অনুষ্ঠান দেখতাম। হোক সে নতুন কুঁড়ি, সাপ্তাহিক কিংবা ধারাবাহিক নাটক, বাংলায় ডাবিং করা বিদেশি সিরিয়াল কিংবা সিনেমার গানের অনুষ্ঠান ‘ছায়াছন্দ’। শুধু কি দেখা? আমরা সেসব অনুষ্ঠান নিয়ে ভাবতাম, পর্যালোচনা করতাম আর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম পরবর্তী পর্ব দেখার। ঘরে ঘরে রাখা হতো টিভি গাইড। সেই টিভি গাইড বারবার উল্টাতে পাল্টাতে মুখস্থ হয়ে যেত এর সব বিষয়বস্তু।

আরেক ভালোলাগার বিষয় ছিল বই পড়া। বাংলা পাঠ্যবইয়ের সব ছড়া-কবিতা কিংবা গল্প বছরের প্রথম দুই-এক মাসের মধ্যেই শেষ হয়ে যেত। তারপর ছিল অকারণ প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করার বিড়ম্বনা। বড় ভাইবোনের বাংলা বইয়ের প্রতি দারুণ আকর্ষণ ছিল ছোটদের। সে সময় পাঠ উপকরণ আজকের মতো সহজলভ্য ছিল না। তাই বইপত্র যত্নের সঙ্গে সংরক্ষণ করা হতো। শিক্ষানুরাগী প্রায় প্রতিটি বাড়িতে ছোট-বড় লাইব্রেরির উপস্থিতি নজরে পড়ত। তবে ছোটদের পাঠ্যবইবহির্ভূত বই পড়ার অভ্যাস নিয়ে বড়দের ছিল বিভিন্ন মতামত।

উদারপন্থী অভিভাবকেরা সন্তানের বই পড়ার ওপর তেমন কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করতেন না। অন্যদিকে আরেক শ্রেণির অভিভাবক ছিলেন, যাঁরা মনে করতেন শিশু বয়সে পাঠ্যবইবহির্ভূত বইয়ের প্রতি আসক্তি পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের ক্ষেত্রে একটি প্রতিবন্ধকতা। এতে সন্তানের অকালপক্ব হয়ে বেড়ে ওঠার আশঙ্কাও রয়েছে।

আমাদের কিশোর বয়সটি পার হয়েছে হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের মাঝে ডুবে ডুবে। বইয়ের সাগরে ডুব দেওয়ার প্রথম সঙ্গী ছিল হুমায়ূন আহমেদের ভূত, ভূতং, ভূতৌ। এরপর থেকে তাঁর বই শুধু পড়েই গেছি। বোতল ভূততিথির নীল তোয়ালেছায়াসঙ্গীনীলহাতিমিসির আলি আরও কত বই! আজও মনে পড়ে, আমার সহপাঠী সেই মেয়েটির কথা, যে স্কুলব্যাগের মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে অদ্ভুত কৌশলে হুমায়ূন আহমেদের বই পড়ত। এসএসসি পরীক্ষার পর লুকিয়ে গল্পের বই পড়ার দিনের অবসান ঘটে। ফলে উন্মুক্ত হয় বাংলা সাহিত্যকে নতুনভাবে জানার। সে সময় রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমসহ সুবিখ্যাত কবি-সাহিত্যিকের অসামান্য রচনাবলি পড়ে শেষ করার মোহ গ্রাস করে ফেলে। পাশাপাশি আঁকড়ে ধরি সুনীল, সমরেশ, শীর্ষেন্দু, বুদ্ধদেব গুহসহ অনেকের বই। সে সময় বিখ্যাত বইগুলো পড়ে ফেলার মধ্যে ছিল একধরনের আত্মতৃপ্তি। অলিখিত প্রতিযোগিতা চলত কে কয়টা বই পড়েছে আর কার বই কত তাড়াতাড়ি শেষ হয়েছে—এসব নিয়ে।

সেই সোনালি সময় আজ অনেকটাই বিলুপ্ত হয়েছে। বই পড়ে বেড়ে ওঠা সেই প্রজন্মের প্রতিনিধি আমরা আজকাল আর বই পড়ি না। বড়জোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বই কেনার কয়েকখানা ছবি তুলে পোস্ট করি প্রতিবছর একুশে বইমেলার সময়। কিন্তু সে বই আর পড়া হয়ে ওঠে না অনেকেরই। না পড়ার কারণ হিসেবে আমরা দায়ী করি জীবনের ব্যস্ততাকে। অথচ বই পড়ার সময় না থাকলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বুঁদ হয়ে থাকার ঢের সময় আছে আমাদের হাতে।

শুধু যে পাঠকই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডুবে আছেন, তা কিন্তু নয়। লেখকও বুঁদ হয়ে আছেন সেখানে। আমরা আজকালকার শিশুদের বই না পড়ার অভ্যাস নিয়ে মহা চিন্তিত। অথচ আমরা বড়রাই এরই মধ্যে নির্বাসনে পাঠিয়েছি আমাদের বই পড়ার সুঅভ্যাসটিকে। ফলে ক্ষয় হচ্ছে মূল্যবোধ, থমকে যাচ্ছে আমাদের সৃজনশীলতা আর মুক্তচিন্তার চর্চা।

আমরা আজ নিজেরাই দিগ্ভ্রান্ত। এই দিগ্ভ্রান্ত প্রজন্ম কীভাবে আরেকটি নতুন প্রজন্মকে পথ দেখাবে! আমরা নিজেরা যা চর্চা করি না, তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আমরা প্রত্যাশা করি কী করে! বইয়ের সঙ্গে বেড়ে ওঠা একটি প্রজন্ম যে পরবর্তী প্রজন্মকে বইমুখী করতে পারছি না, এ লজ্জা আমাদের সবার।

সৈয়দ মুজতবা আলীর বই কেনা প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেছিলেন আনাতোল ফ্রাঁসের। আনাতোল ফ্রাঁস নাকি বলেছিলেন, ‘মনের চোখ বাড়ানো-কমানো তো সম্পূর্ণ আমার হাতে। নানা জ্ঞান-বিজ্ঞান যতই আমি আয়ত্ত করতে থাকি, ততই এক-একটা করে আমার মনের চোখ ফুটতে থাকে।’ চোখ বাড়াবার পন্থা হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছিলেন বই পড়ার কথা।

আমাদের দৃষ্টিসীমা আজ স্মার্টফোনের চার দেয়ালে বন্দী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতি আসক্তি আর প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার ফলে আমাদের মনের চোখের দৃষ্টি দিন দিন ক্ষীণ হয়ে আসছে। জটিল চক্ষুরোগেরও তো চিকিৎসা হয়; কিন্তু ক্ষয়ে যাওয়া অন্তর্দৃষ্টির চিকিৎসা কী?

দৈনিক গোপালগঞ্জ
দৈনিক গোপালগঞ্জ