• শুক্রবার   ০৫ জুন ২০২০ ||

  • জ্যৈষ্ঠ ২২ ১৪২৭

  • || ১৩ শাওয়াল ১৪৪১

দৈনিক গোপালগঞ্জ
৮০

‘রাত ১২টায় এসে বলে, সবাইকে আদার পানি খেতে হবে’

দৈনিক গোপালগঞ্জ

প্রকাশিত: ১২ এপ্রিল ২০২০  

গোটা বিশ্বের মানুষের মতো ঘরবন্দি জীবন কাটাচ্ছেন তারকা দম্পতি রোবেনা রেজা জুঁই ও মোশাররফ করিম। করোনা সংক্রমণ রোধে সমস্ত শুটিং বন্ধ। তাই আপাতত অ্যাকশন-কাটের বাইরে রয়েছেন তারা। তাদের সাম্প্রতিক সময় নিয়ে কথা বলেছেন জুঁই।

কেমন আছেন?
জুঁই: এই পরিস্থিতিতে কেমন আর থাকা যায়! এখন পর্যন্ত সুস্থ আছি, এতটুকু বলতে পারি। কিন্তু কালকে সুস্থ থাকতে পারব কিনা জানি না। যতটা সম্ভব চেষ্টা করছি বাইরে না বের হওয়ার। প্রয়োজনীয় বাজার করা ছাড়া বাইরে বের হচ্ছি না। কাঁচা বাজারটা এমনভাবে করছি যাতে ৩/৪ দিনের খাবার ব্যবস্থা হয়ে যায়। লকডাউন শুরুর দিকে শুকনা বাজার মোটামুটি করে রেখেছিলাম। আসলে চতুর্দিকের খবর দেখে মনকে শান্ত করতে পারছি না। একটা অস্থিরতা কাজ করে—সবাই কেমন আছে, কেমন থাকবে। কারণ এটা তো অনিশ্চিত একটা বিষয়। এখন না হয় চলছি, কিন্তু মনে হচ্ছে এটা দীর্ঘ মেয়াদি একটা সমস্যা। পরে গিয়ে কী হবে না হবে, এটা যখন চিন্তা করি তখন খারাপ থাকি। তখন আর ভালো থাকতে পারি না।

টুকটাক বাইরে যাচ্ছেন। এক্ষেত্রে কতটা প্রোটেকশন নিচ্ছেন? 
জুঁই: বাজার করার জন্য আমার তো টুকটাক বের হতেই হচ্ছে। যখন বের হচ্ছি তখন পুরোপুরি প্রোটেকশন নিয়েই বের হচ্ছি। মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস পরছি, মাথায় স্কার্ফ দিয়ে ঢেকে নিচ্ছি। শরীরের কোনো অংশ যাতে বের হয়ে না থাকে সে দিকেও খেয়াল রাখছি। বাসার নীচে জীবাণুনাশক স্প্রিরের ব্যবস্থা করেছি। বাইরে থেকে ফিরে গাড়ি, নিজের জুতা থেকে শুরু করে পুরো শরীরে স্প্রে করে নিচ্ছি। বাসায় ঢুকে জামা-কাপড় পরিষ্কার করছি, নিজেও শাওয়ার নিচ্ছি। যতটুকু সম্ভব হচ্ছে এসব মেইনটেইন করছি।

এখন তো শুটিং বন্ধ…
জুঁই: হ্যাঁ, সমস্ত কাজ এখন বন্ধ। মানসিক চাপের পাশাপাশি অর্থনৈতিক একটা ক্ষতি হচ্ছে। সব মিলিয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দেশের বড় অংশের মানুষ মধ্য আয়ের। খুব কম সংখ্যক মানুষ ভালো অবস্থায় আছেন। যারা ভালো অবস্থায় আছেন তাদের উপরও দেশের বড় একটা অংশের মানুষ নির্ভরশীল। আয় বন্ধ হয়ে গেছে কিন্তু ওই মানুষদেরকেও এদের মেইনটেইন করতে হচ্ছে। মানে যারা মিল ফ্যাক্টরির মালিক তাদের কথা বলছি। আবার আমাদের মতো যারা আছেন, তারা তো কাজ করলে টাকা আসে না করলে নাই। কারণ আমরা তো চাকরি করি না। এজন্য প্রত্যাশাও করা যাবে না যে, আমরা মাসের বেতনটা পাব। অর্থাৎ দৈনিক মজুরিতে যারা কাজ করেন আমি তাদের কথা বলছি। তাদেরও একটা ক্রাইসিস মোমেন্ট যাচ্ছে। কাজ নাই মানে অর্থ নাই। এক্ষেত্রে কারো হয়তো মজুরি ৩০০ টাকা আবার কারো হয়তো ৩ হাজার টাকা। সবকিছু মিলিয়ে কিছু ভালো লাগে না।

বাসায় সময় কীভাবে কাটাচ্ছেন?
জুঁই: আমি ফেসবুকে ঢোকা ছেড়ে দিয়েছি। গত এক সপ্তাহ ধরে ফেসবুকে নেই। নিউজ সাইটেও ঢুকছি না। মুঠোফোনও ধরি না। আসলে আমি একবার কিছুতে ঢোকে গেলে বের হতে পারি না। মানসিকভাবে তখন অসুস্থ বোধ করি। স্বাভাবিক থাকতে পারি না। বাসার কাজকর্ম করে যতটুকু সময় পাচ্ছি, ততটুকু টেলিভিশনে সিনেমা দেখে কাটাচ্ছি।

আপনার বর (মোশাররফ করিম) কেমন আছেন?
জুঁই: গত ১৫-১৬ বছর প্রচন্ড ব্যস্ত থেকেছে ও, সেখান থেকে একদমই কাজকর্ম ছাড়া। এতে সে কিছুটা বিশ্রাম পাচ্ছে। কিন্তু একটা মানুষ তো আসলে টানা বিশ্রাম নিতে পারে না। আপনি টানা এক সপ্তাহ কাজ করলেন, তারপর বিশ্রাম নিলেন সেটা একরকম বিষয়। কিন্তু টানা শুধু বিশ্রাম নেওয়াটা কঠিন। তাও আবার বাসার মধ্যে বন্দি থাকা। এমন যদি হতো যে, বাসায় আছে কিন্তু দিনের একটা অংশে বাইরে আড্ডা দেওয়া কিংবা আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সময় কাটানো অথবা বাসায় কেউ আসল তার সঙ্গে কথা বলা—তেমনটার তো সুযোগ নেই। ওর জন্য আসলে সময় পার করাটা কঠিন হয়ে গিয়েছে। আমার তো রান্নাবান্না করে সময় কেটে যাচ্ছে। কিন্তু ওর সেই সুযোগও নেই। বাচ্চার সঙ্গে খেলছে, মাঝে মাঝে টিভি দেখছে, ছাদে যাচ্ছে। আবার রান্না ঘরে বউ-শ্বাশুড়ি কী করছি তা এসে দেখে যাচ্ছে।

এর আগে আপনি তার (মোশাররফ করিম) কাছে সময় চেয়েছিলেন। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে সময় পেলেন...
জুঁই: আসলে সবকিছু তো মানসিকভাবে উপভোগ করার ব্যাপার। দুঃচিন্তা নিয়ে তো উপভোগ করা যায় না। প্রথম ৫-৭ দিন ঠিক ছিল। ও তো নিয়মিত খবরও দেখে। এতে করে ওর মানসিক একটা চাপ কাজ করে। এমনিতে ও অন্তর্মুখী মানুষ। পারিপার্শ্বিক এসব বিষয় নিয়ে ভেতরে ভেতরে দুঃশ্চিন্তা করে। আমি আমার শ্বাশুড়ি, ভাসুরের মেয়েরা সবাই সবার সঙ্গে সব কিছু শেয়ার করি, আলোচনা করি, গল্প করি। কিন্তু ও ভেতরে ভেতরে সব পোষে রাখে। মাঝে মধ্যে এসে জিজ্ঞাসা করে— আদার পানি খেয়েছি কিনা। কিংবা রাত ১২টা সময় এসে বলে, এই সবাইকে আদার পানি খেতে হবে। কিংবা ও বলে উঠছে, লেবু দাও, আদা দাও, মধু দাও। আমি বুঝতে পারি, ও যখনই বেশি চিন্তিত হয়ে পড়ছে তখনই এমনটা করছে। বাজার করতে যেতেও নিষেধ করছে। আসলে হাতে অফুরন্ত সময় কিন্তু উপভোগ করা যাচ্ছে না। এখন সৃষ্টিকর্তাকে ডাকা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

প্রকৃতির বিরূপ আচরণ…
জুঁই: হ্যাঁ, আমরা প্রকৃতির উপর এতটা নির্যাতন করেছি যে, হয়তো এর রাশ টানা দরকার ছিল। এর আগে খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী এরকম… ভাবা যায় না! প্রত্যেকটা দেশকে অচল করে আল্লাহ দেখিয়ে দিলেন, তোমরা আসলে সীমা অতিক্রম করে ফেলেছো, এবার একটু থামো। আসলে এখন কিছু করার নাই। সৃষ্টিকর্তা যেদিন চাইবেন সেদিন এসব নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। মানুষ ভ্যাকসিন আবিষ্কারের জন্য যার যার জায়গা থেকে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন কিন্তু জানি না কতটা কী হবে। ভ্যাকসিন তৈরি হলেও সেটা কত দিনে আসবে! ততদিনে গোটা পৃথিবীর উপর কেমন প্রভাব পড়বে, মানবশক্তি, অর্থনীতির কতটা ক্ষতি হবে—তার কিচ্ছু জানি না।

দৈনিক গোপালগঞ্জ
দৈনিক গোপালগঞ্জ