• রোববার   ০৭ জুন ২০২০ ||

  • জ্যৈষ্ঠ ২৪ ১৪২৭

  • || ১৫ শাওয়াল ১৪৪১

দৈনিক গোপালগঞ্জ
৬৪

সাকিবকে অনুসরণ করি: এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে মুরাদ

দৈনিক গোপালগঞ্জ

প্রকাশিত: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের শহর কক্সবাজারে বেড়ে ওঠা তরুণ হাসান মুরাদ। পাড়ার অলি-গলিতে ক্রিকেট নিয়ে মেতে থাকতো। ২০১১ সালে তরুণ প্রতিভা অন্বেষণে নজর কেড়ে ২০১২ সালে বিকেএসপিতে ভর্তির সুযোগ হয় এ তরুণের।

এরপর ৩ মাসের ক্যাম্প থেকে অনূর্ধ্ব-১৪ দলে সুযোগ পান এ অফ স্পিনার। বিকেএসপি থেকে পর্যায়ক্রমে বয়সভিত্তিক, প্রথম বিভাগ, প্রিমিয়ার লিগ, নিউজিল্যান্ড সফর ও ঘরের মাঠে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ভালো পারফরম্যান্সের সুবাদে ডাক পড়ে যায় সদ্য ট্রফিজয়ী যুব বিশ্বকাপ দলে। বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ও সেমিফাইনালে সাফল্যের সাথে দলে অবদান রাখতে পেরে গর্বিত দেশের ক্রিকেটের উদীয়মান এ তরুণ। বিস্ময়কর এই যুবকের ক্রিকেটে পদার্পণ ও বিশ্বজয়ের গল্প পাঠকের কাছে তুলে ধরা হলো:

বিশ্বকাপ জয় করে বাড়ি ফিরে সংবর্ধনা পেলেন কেমন লাগছে?
হাসান মুরাদ: মুচকি হাসি! অনেক....বেশি ভালো। যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। ভাবতেই পারিনি সবাই এতো ভালবেসে বরণ করে নেবে। এ জন্য কক্সবাজার জেলাবাসীর কাছে আমি কৃতজ্ঞ।

ক্রিকেটে যাত্রা শুরু কবে?
হাসান মুরাদ: ২০১১ সালে বিসিবির প্রতিভা অন্বেষণের ক্যাম্প হয়। ওই অন্বেষণে প্রথমে আমি চট্টগ্রামে গিয়ে ট্রায়াল দিই। মজার বিষয় হচ্ছে, ওখানে ট্রায়াল দিয়েছিলাম পেস বোলার হিসেবে, ট্রায়াল দেয়ার পর ভর্তি হয়ে যাই বিকেএসপিতে। এরপর দুই মাসের ক্যাম্পের জন্য চলে যাই বরিশালে। ক্যাম্পে থাকাকালীন মাঝখানে আবার লেগ স্পিনার হয়ে যাই। লেগ স্পিনার হওয়ার পর থেকে ওটা নিয়মিত চর্চা করি, এরপর বিকেএসপিতে প্রতিবছর ৫ দিনের একটা ট্রায়াল হয় সেখানে ট্রায়াল দেয়ার পর ৭ দিনের ক্যাম্পে সুযোগ হয়। ওই সময়ে প্র্যাকটিস, ম্যাচ সবকিছুতে ভাল করায় বিকেএসপিতে ভর্তির সুযোগ পাই। এরপর যাত্রা হয় ক্রিকেটের। ২০১২ সাল থেকে বিকেএসপিতে বয়স ভিত্তিক ক্রিকেট অনুর্ধ্ব-১৪, ১৫, ১৬, ১৭, ১৮ ছাড়াও দু’বার বিভাগীয় এবং একবার প্রিমিয়ার লীগ খেলেছি। 

অনুর্ধ্ব-১৯ সুযোগ পেলেন কবে?
হাসান মুরাদ: গত বছর প্রিমিয়ার লীগ খেলার সুবাদে আমার পারফরম্যান্স ভালো হতে থাকে। স্পিনারদের মধ্যে ২২ ইউকেট নিয়ে ১ নম্বর বোলার হয়েছিলাম। এছাড়া টুর্ণামেন্টে ৪ নম্বর বোলার হয়েছিলাম। এরপর ওখানে আমাকে অনুর্ধ্ব-১৯ দলে ডাকা হয়। এরপর থেকেই বর্তমান দলের সাথে আমি যোগ দিই। 
ক্রিকেটার হওয়ার পেছনে কার অবদান বেশি?
হাসান মুরাদ: অনেকেরই অবদান আছে। প্রথমত আমার পরিবার, আমার জেলাবাসী সবার ভালোবাসা এবং সাপোর্ট পেয়েছি। আমার একদম শুরুতে আমার ক্রিকেট যখন শুরু হয় আমার একট গৃহ শিক্ষক ছিল বাসায় (নাম আতিকুর রহমান) প্রথমে উনিই আমাকে সবকিছুতে সাহায্য করেছেন। বিকেএসপিতে ভর্তি করানোর জন্য অনেক পরিশ্রমও করেছেন। 

এ পর্যন্ত দেশের বাইরে কয়টি সিরিজ খেলেছেন?
হাসান মুরাদ: বিদেশের মাটিতে দুইটা সিরিজ খেলেছি। একটা হচ্ছে বিশ্বকাপের আগে নিউজিল্যান্ড সফর আরেকটা বিশ্বকাপ। এছাড়া দেশের মাটিতে গত বছরের অক্টোবর-নভেম্বরে শ্রীলঙ্কার সাথে হোম সিরিজ খেলেছিলাম।
 


বিশ্বকাপ এবং নিউজিল্যান্ড সিরিজে পারফরম্যান্স কেমন ছিল?
হাসান মুরাদ: এই প্রথম দেশের বাইরে আমি সিরিজ খেলতে গিয়েছিলাম। ওই সিরিজে তিন ম্যাচে ৫ ইউকেট নিয়েছিলাম। এছাড়া বিশ্বকাপে দুই ম্যাচে পেয়েছি ৩ উইকেট।

বিশ্বকাপে যাওয়ার আগে দলের আত্মবিশ্বাস কেমন ছিল?
হাসান মুরাদ: আমাদের টিমটা খুবই ভালো। টিমের প্রতি আত্মবিশ্বাস ছিল অনেক। ব্যাটিং-বোলিং ফিল্ডিং এবং কোচিং স্টাফ সবাই অসাধারণ। তারা আমাদের অনেক আত্মবিশ্বাস দিতো। এই আত্মবিশ্বাস নিয়ে আমরা বিশ্বকাপের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। বিশ্বকাপের ১০ দিন আগে আমরা দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছি। সেখানে ১০ দিনের কন্ডিশনিং ক্যাম্প হয়। সবচেয়ে বড় কথা বিশ্বকাপের আগে আমরা নিউজিল্যান্ড সিরিজ খেলেছি, ওই সিরিজ আমাদের অনেক সহায়তা করেছে।

ক্রিকেট থেকে পরিবার কী চেয়েছে?
হাসান মুরাদ: দেখুন, সন্তান বড় হওয়ার পেছনে বাবা-মা’র অবদানই অনেক বেশি, বলে শেষ করা যাবে না। আমার আব্বু প্রতিদিন রাত ১০টায় ফোন করতো, কল দেয়ার পর তিনটা কথা বলতো। কি বলতো? বলতো,  বেশি বেশি প্র্যাকটিস করতে হবে, অনেক পরিশ্রম করতে হবে, নিজেকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে গড়ে তোলার জন্য তৈরি করতে হবে। এই কথাগুলো আমাকে আত্মবিশ্বাস যোগাতো। প্রতিদিন বাবার এই কথাগুলো শুনে ঘুমাতাম, সকালে উঠে বাবার আদেশ মেনে চলতাম।

খারাপ সময়ে কারা পাশে ছিলেন?
হাসান মুরাদ: ভালো সময় এবং খারাপ সময়ে পরিবার ছাড়াও অনেকে আমার পাশে ছিলেন। এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া। কক্সবাজারের অনেকেই পাশে ছিলেন, সাহায্য করেছেন। আমার এক আঙ্কেল আছে সাজ্জাদ এবং জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল খালেক আঙ্কেল উনার অবদান অনেক বেশি। আমি এতদূর আসার পেছনে তাদের এত ভূমিকা যা বলে শেষ করা যাবে না।

কখনো বাঁধার সম্মুখীন হয়েছেন?
হাসান মুরাদ: সবারই জীবনে ছোটো-খাটো অনেক রকম বাঁধা থাকে। ঐ ক্ষেত্রে আমারই তাই ছিল। পরিবারের অবস্থা তেমন ভালো ছিল না। তবে সবকিছু ছাপিয়ে আমি ক্রিকেট নিয়েই স্বপ্ন দেখেছি। কখনো সমস্যাকে চাপ হিসেবে নিইনি। সবকিছু সহজভাবে নিতাম, ভেঙ্গে পড়তাম না।

পরিবারের চাপ ছিল কি?
হাসান মুরাদ: এক কথায় আমাকে কখনো ফ্যামেলি থেকে চাপ দেয়া হয়নি। কারণ, আমি যখন বিকেএসপিতে সুযোগ পাই ওখানে ক্যাডেটদের মতো একটা লাইফস্টাইল থাকতো। যার জন্য ফ্যামেলি কখনো চিন্তা করতো না। পরিবার থেকে সবসময় স্বাধীনতা পেয়েছি। আস্তে আস্তে যখন ভালো খেলতে শুরু করি তখন সবাই আরো উৎসাহ দিয়েছি।

কাকে অনুসরণ করে ক্রিকেটার হলেন?
হাসান মুরাদ: যখন আমি ক্রিকেট বুঝতে শিখি তখন থেকেই আমি দেশের ক্রিকেটের বরপুত্র সাকিব আল হাসানের খেলা দেখতাম। উনার বোলিং যখন দেখতাম কেমন জানি অনেক ভালো লাগতো, তখন থেকেই মনে মনে উনাকে অনুসরণ করি। সাকিব ভাইয়ের বোলিং অ্যাকশন, আচরণ, মানসিক দিক সবগুলোই আমাকে খুব মুগ্ধ করে। তাছাড়া দেশের বাইরের ভারতের অলরাউন্ডার রবিন্দ্র জাদেজা, অস্টেলিয়ার অপ-স্পিনার নাথান লায়নকে আমার ভালো লাগে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার, যখন কোন স্পিনার বোলিং করে তখই আমি খেলা দেখতে বসে পড়ি।

জাতীয় দলে সুযোগ পেলে কার উইকেট পেতে চান?
হাসান মুরাদ: অনেক কঠিন প্রশ্ন! হাসি মুরাদের... বললেন, বিশ্বের অনেক ব্যাটসম্যান আছেন তারপরও আমার যদি কোনোদিন জাতীয় দলে খেলার সুযোগ হয় তাহলে ভারতের তারকা ব্যাটসম্যান বিরাট কোহলির উইকেট শিকার করতে চাই। বর্তমান সময়ে তার উইকেটটা অনেক মূল্যবান।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?
হাসান মুরাদ: এখন আমার অনুর্ধ্ব-১৯ শেষ। সামনে একমাস পরে প্রিমিয়ার লীগ শুরু হবে আপাতত ওটা নিয়ে ভাবছি। অবশ্যই অনুর্ধ্ব-১৯ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর আত্মবিশ্বাসটা অনেক বেড়ে গেছে। সেহেতু অনেক বড় টুর্ণামেন্টে খেলার সুযোগ হয়েছে সেই আত্মবিশ্বাস এবং অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে কাজে লাগানোর চেষ্টা করব।  এর বাইরে পরিকল্পনা বলতে প্রথম ধাপ পার করে পরের ধাপে অনেক পরিশ্রম করতে হবে সেই ক্ষেত্রে আমাদের নিয়ে বিসিবি সভাপতি বলেছেন দু’বছরের জন্য অনুর্ধ্ব-২১ ইউনিট গঠন করা হবে এবং তাদের পরিচর্যায় রাখা হবে, ভালো প্র্যাকটিস থেকে ফ্যাসিলিটিজ দিবে আমাদের সবারই পরিকল্পনা থাকবে যাতে ঐ সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারি। তাছাড়া আমার ব্যক্তিগত পরিকল্পনা থাকবে কিভাবে স্কিলের উন্নতি করা যায়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ের খেলোয়াড় হতে পারি, ভালো পারফরম্যান্স উপহার দিতে পারি। সেই জন্য আমার স্কিল, মানসিকভাবে প্রস্তুতির জন্য বেশি বেশি কাজ করব।

দেশের হয়ে জাতীয় দলে খেলতে চান?
হাসান মুরাদ: আসলে দেশের হয়ে খেলার অনুভূবটা আমি এখন বুঝতে পারছি। এর আগে আমি দেশের হয়ে অনুর্ধ্ব-১৯ খেলিনি। প্রথম যখন নিউজিল্যান্ড সিরিজ খেললাম ওখানেও আমার কোন আলাদা তেমন কিছু অনুভূব করতে পারিনি। যখন বিশ্বকাপে গেলাম ম্যাচ শুরুর আগে জাতীয় সংগীত বাজানো হয় তখন নিজের দেশের পতাকার সামনে দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীত গাওয়া অনেকের ভাগ্যে হয়না সেটা, যেটা বলে বুঝানো যাবেনা। তাই চেষ্টা করব ভালো পারফরম্যান্সের মাধ্যমে ভবিষ্যতের জন্য তৈরি হতে।

ক্রিকেটারদের মধ্যে প্রিয় বন্ধু কে?
হাসান মুরাদ: আমাদের দলের সবাই আমার ভালো বন্ধু। তবে ক্লোজ বন্ধু বলতে ক্যাপ্টেন আকবর আলীই কাছের বন্ধু। আমরা বিকেএসপিতে পড়াশোনা, খেলাধুলাসহ সবকিছুই একসাথে করেছি। এর বাইরে জাতীয় দলে খেলা লেগ স্পিন অলরাউন্ডার আমিনুল ইসলাম বিপ্লব আমার বন্ধু। তাছাড়া কাছের অনেক বন্ধু আছে এক জনের নাম বললে অন্যরা ক্ষেপে যাবে!

হাসান মুরাদ, কক্সবাজার শহরের লিংকরোড মুহুরী পাড়ার নাজিম উদ্দিন নাজু ও রাশেদা বেগমের ছেলে। চার ভাইয়ের মধ্যে মুরাদ দ্বিতীয়। তার বড় ভাই ফরিদুল আলম সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, ছোটভাই শাখাওয়া হোসেন গাড়ি চালক, আরেক ছোট ভাই ইরফান দশম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে।

দৈনিক গোপালগঞ্জ
দৈনিক গোপালগঞ্জ