ব্রেকিং:
ফরিদপুরে যুবদল নেতা গ্রেফতার গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার ‘বি’ ইউনিটের ফল প্রকাশ মাদারীপুরে সাপের ছোবলে বিজিবি সদস্যের মৃত্যু নয়াপল্টনে পুলিশের ওপর বিএনপি নেতাকর্মীদের হামলা, গ্রেফতার ৪৪ হবিগঞ্জের মাধবপুরে দুই ট্রাকের সংঘর্ষ, নিহত ২
  • বুধবার   ২৭ অক্টোবর ২০২১ ||

  • কার্তিক ১২ ১৪২৮

  • || ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

দৈনিক গোপালগঞ্জ

উন্নয়নের স্বর্ণযুগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া

দৈনিক গোপালগঞ্জ

প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর ২০২১  

সংস্কৃতির রাজধানী খ্যাত ব্রাহ্মণবাড়িয়া। পৃথিবী খ্যাত সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর জন্মভূমি এখানেই। তিতাস ও মেঘনা নদীবেষ্ঠিত জেলা। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর সীমান্তঘেঁষা এ জেলাটি। এক দশক আগেও এই ব্রাহ্মণবাড়িয়া খুবই অবহেলিত ছিল। মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল এখানকার মানুষ। উন্নয়ন ছিল স্বপ্নের মতো। মাত্র কয়েক বছরে সবটাই যেন বদলে গেছে। তাক লেগেছে উন্নয়নে। অনুুন্নয়নের বেড়াজাল ছিন্ন করে এগিয়ে চলছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর এক সময়ের অনুন্নত জেলায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন হয়েছে। এমন কোন সেক্টর নেই যেখানে উন্নয়ন আর আধুনিকতার ছোঁয়া স্পর্শ করেনি। প্রাকৃতিক গ্যাস ভা-ার সংবলিত ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে গ্যাস ও বিদ্যুতের রাজধানী বলেও ডাকা হয়। মেঘনা নদী এ জেলাকে ভাগ করেছে আশুগঞ্জ দিয়ে। অনুন্নয়নের সকল অচলায়তন ভেঙ্গে মেঘনা তীরবর্তী ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হাজার হাজার কোটি টাকার মেঘা প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজ চলমান।

বিদ্যুত সেক্টরে অভাবনীয় সাফল্য ॥ দেশের জ্বালানি সেক্টরে গত এক দশকে অভাবনীয় উন্নয়ন ঘটেছে। মেঘনার তীরঘেঁষা আশুগঞ্জে গড়ে উঠেছে দক্ষিণ এশিয়ার সর্বাধিক পাওয়ার প্লান্ট। মাত্র ২৮৫ একর জমির ওপর গড়ে উঠেছে সর্বাধিক ৮টি পাওয়ার প্লান্ট। এসব পাওয়ার প্লান্ট থেকে ১৫শ’ ৬১ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন হচ্ছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের। সূত্র জানায়, পাওয়ার প্লান্টগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা ১৬শ’ ৯০ মেগাওয়াট। সব প্লান্টই গ্যাসচালিত। এক দশকে এসব প্লান্টের পেছনে ব্যয় হয়েছে ১১ হাজার ৫শ’ ৯৮ কোটি টাকা। ২০১১ সাল থেকে এ পর্যন্ত এসব অর্থ ব্যয় হয়। এতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয় অন্তত ৫শত লোকের। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা থেকে শুরু করে শ্রমিক পর্যন্ত রয়েছে। জার্মান, বেলজিয়াম, স্পেন, কোরিয়া ও বিশ্ব ব্যাংক প্লান্ট নির্মাণে অর্থনৈতিক সহযোগিতা করেছে। আর এডিবি ও আইডিবি লোন দিয়েছে মোটা অঙ্কের অর্থ। বাংলাদেশ সরকার প্রকল্পগুলোতে নিজস্ব অর্থ ব্যয় করেছে ৭শ’ ৭৬ কোটি টাকা। মেগা এসব প্রকল্পে কারিগরি সহায়তা প্রদান করে চীন, জার্মান, স্পেন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো। জাতীয় বিদ্যুত গ্রিডে সরকারী-বেসরকারী উৎপাদনের ৭.৮ ভাগ বিদ্যুত সরবরাহ করে আশুগঞ্জ পাওয়ার প্লান্ট এ সেক্টরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। সূত্র জানায়, আশুগঞ্জ ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুত প্লান্ট ২০১১ সালের ৩ এপ্রিল চালু হয়। এতে ব্যয় হয় ৩ হাজার ৫৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা। ২শ’ ২৫ মেগাওয়াট সিসিপিপি প্লান্ট চালু হয় ২০১৫ সালের ১২ অক্টোবর। এতে ১ হাজার ৯শ’ ৮২ কোটি ৫১ লাখ টাকা ব্যয় হয়। ৪৫০ মেগাওয়াট সিসিপিপি (সাউথ) প্লান্ট চালু হয় ২০১৬ সালের ২২ জুলাই। এতে ব্যয় হয় ৩ হাজার ৬শ’ ৭৫ কোটি ২৭ লাখ টাকা। ২০১৭ সালের ৬ জুন ৪৫০ মেগাওয়াট সিসিপিপি (নর্থ) প্লান্ট চালু হয়। এতে ব্যয় হয় ২ হাজার ৬শ’ ৫৭ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। চলতি বছরের জুন মাসে ৪শ’ মেগাওয়াট সিসিপিপি (পূর্ব) ইউনিট চালু হয়। এতে ব্যয় হয় ২ হাজার ৯শ’ ৩১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এছাড়াও বিদ্যুত সেক্টরে অনেক পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

তরল সোনায় উন্নয়নের ঝিলিক ॥ তরল সোনা প্রাকৃতিক গ্যাস। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আছে এর অফূরন্ত ভান্ডার। ৬০ এর দশকের প্রথম ভাগ থেকে সর্ব প্রথম এই তরল সোনা উৎপাদনের কাজ শুরু হয়। প্রায় ৫০ বছরেরও অধিক সময় ধরে সমানে চলছে এর উৎপাদন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রাকৃতিক গ্যাস জেলা তো বটেই গোটা দেশকে করেছে সমৃদ্ধ। আবাসিক জ্বালানির চাহিদা, শিল্প-কলকারখানায় এর ব্যবহার অপ্রতিদ্বন্দ¦ী। গত এক দশকে জেলায় প্রাকৃতিক গ্যাসের ১৩ টি নতুন কূপ খনন করা হয়েছে। এসব কূপ থেকে প্রতিদিন ১৪২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন চলছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যুগান্তকারী এই খনন কাজ সম্পন্ন হয়েছে। শুধু তাই নয়, এ সময়ে ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপ কাজটিও সম্পন্ন হয়। সে সঙ্গে নির্মাণ করা হয় ৫ টি প্রসেস প্লান্ট। এর দুটি বাখরাবাদে বাকি ৩টি ব্রাহ্মণবাড়িয়া তিতাস ফিল্ডে। খননকৃত কূপগুলোর মধ্যে তিতাস ১৭, ১৮, ১৯, ২০, ২১, ২২, ২৩, ২৪, ২৫, ২৬ ও ২৭ কূপ খনন কাজে সহায়তা করে রাশিয়া, চীন ও বাপেক্স। প্রসেস প্লান্টগুলোতে গড়ে প্রতিদিন ১৩০/১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রসেস করা হয়। এর ক্যাপাসিটি অবশ্য ৩শ’ ৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। সূত্র জানায়, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডের অধীনস্ত গ্যাস ক্ষেত্রের ৫টি লোকেশন সৃষ্টি করা হয়েছে। এর মধ্যে বাখরাবাদে ১টি ও বাকি ৪টি তিতাস ফিল্ডে। সূত্রটি জানিয়েছে, বাংলাদেশ গ্যাসফিল্ড তাদের কূপ খনন, ত্রিমাত্রিক জরিপ, কমপ্রেসার প্লান্ট স্থাপন, কূপের ওয়ার্কওভার খাতে গত ১০ বছরে ৩ হাজার ২শ’ কোটি টাকা ব্যয় করে। গ্যাস ক্ষেত্রের উন্নয়নে এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ২শ’ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৩টি কূপ খননে ব্যয় হয় ২ হাজার ৬শ’ ৫৫ কোটি টাকা। ১৩ কূপ খনন, প্রসেস প্লান্ট, নতুন স্থাপনাসহ থ্রিডি সার্ভেতে খরচ হয় ২ হাজার ৬শ’ ৫৫ কোটি টাকা। ৩টি কমপ্রেসার প্লান্ট স্থাপনে ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। ওয়ার্কওভারে ব্যয় হয় ৭শ’ ৫৫ কোটি টাকা। ২০০৯ সালের পর ২০টি কূপ ওয়ার্কওভার করা হয়।

এর মধ্যে ১৩ টি কূপ খননে এডিবি, জিওবি (গ্যাস ডেভেলপমেন্ট ফান্ড), বাংলাদেশ গ্যাসফিল্ডের (বিজিএফসিএল) নিজস্ব অর্থ, গ্যাস ডেভেলপমেন্ট ফান্ড, নিজস্ব ও জিডিএফ এতে অর্থ খরচ করে। এছাড়া বাখরাবাদ গ্যাস ক্ষেত্রে ৯৩ কোটি টাকা ব্যয়ে গ্যাস ডেভেলপমেন্ট ফান্ড কমপ্রেসার প্লান্ট বাস্তবায়ন করেছে। তিতাস গ্যাস ক্ষেত্রে ৩টি কমপ্রেসার প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজ চলছে। এতে ব্যয় হবে ২ হাজার কোটি টাকা। ২০২৬ সালের জুন মাসের মধ্যে পর্যায়ক্রমে এসব কাজ বাস্তবায়ন হবে। ২০১৪ সালের জুলাই মাস থেকে এর কার্যক্রম শুরু হয়। এর ১টিতে অর্থ প্রদান করেছে এডিবি ও জাইকা (জাপান)। অন্যগুলো নিজস্ব অর্থ বিজিএফসিএল অর্থ সহায়তা দিয়েছে। কমপ্রেসারগুলোর কাজ বাস্তবায়ন হলে গ্যাসের চাপ বাড়ানো যাবে। ২০০৯ সালের পর থেকে তিতাস গ্যাস ক্ষেত্রের ২০টি কূপ ওয়ার্কওভার করা হয়। এতে ৭শ’ ৩৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়। ওয়ার্কওভার কাজ এখনও চলমান। সূত্র জানিয়েছে, ওয়ার্কওভার কাজ শেষ হওয়ায় ইতোমধ্যে ১১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন বেড়েছে। থ্রিডি সার্ভে অর্থাৎ তিতাসের ত্রিমাত্রিক জরিপ কার্য পরিচালনার জন্য ৩শ’ ৩৫ বর্গ কিলোমিটার ও বাখরাবাদের ২১০ বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে জরিপ কার্য পরিচালনা করা হয়। বাংলাদেশ গ্যাসফিল্ডের অধীনে ৬টি গ্যাসফিল্ড রয়েছে। এর মধ্যে ৫১টি গ্যাস কূপ আছে। ৪২টি কূপ উৎপাদনে রয়েছে। প্রতিদিন বাংলাদেশ গ্যাসফিল্ড জাতীয় গ্যাস গ্রিডে ৬শ’ ২০ থেকে ৬শ’ ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করছে। ২০১৯-২০২১ অর্থ বছরে ২শ’ ৩.৯৮ কোটি টাকা করপূর্বক মুনাফা আয় করে। এ সময় সরকারী কোষাগারে বাংলাদেশ গ্যাসফিল্ড জমা দিয়েছে ৬শ’ ৮১. ০৫ কোটি টাকার, ভ্যাট, লভ্যাংশ ও আয়কর প্রদান করে।

বাংলাদেশ গ্যাসফিল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তৌফিকুর রহমান তপু বলেন, আমাদের ত্রিমাত্রিক জরিপ কাজের ওপর ভিত্তি করে চাইনিজরা কিছু পরিকল্পনা দিয়েছে। সেগুলো বাস্তবায়ন করলে কতটুকু সফল হবে জানি না। তবে আমাদের দেখতে হবে আরও কোন সেন্ট বা আরও কোন লেয়ার আছে কি না। এটা সত্য আমাদের গ্যাস প্রবাহ কমছে। আমাদের অনেক পরিকল্পনা রয়েছে। কমপ্রেসার না বসালে প্লান্টগুলো বন্ধ হয়ে যেত। এসব উন্নয়ন কাজ করা ছাড়া উপায় ছিল না। বাস্তবাতার খাতিরেই তা করতে হয়েছে।

ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন শেখ হাসিনা সড়ক ॥ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় উন্নয়নের আরেক চমক শেখ হাসিনা সড়ক। এ সড়ক নির্মাণ শেষ হলে বদলে যাবে তিতাস পূর্বাঞ্চলের পুরো চিত্র। স্বাধীনতার ৪৮ বছর পর বাস্তবায়নের পথে তিতাস পূর্বাঞ্চলের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের সঙ্গে (তিতাস পূর্বাঞ্চল) বিজয়নগর উপজেলার সরাসরি বিকল্প শেখ হাসিনা সড়ক। এ উপজেলাবাসীর দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ হতে চলছে। দ্রুত এগিয়ে চলছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের কাজ। ইতোমধ্যে সড়কের ৮০ ভাগ কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। এ অবস্থায় সড়কটিকে ঘিরে দুই উপজেলার অন্তত ৬ লাখ মানুষ নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন। এ সড়কটি সম্পন্ন হওয়ার ফলে পাল্টে যাবে বিজয়নগরের চিত্র। এ অঞ্চলের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে।

সড়ক উন্নয়নে স্বর্ণযুগ, ২১ হাজার কিঃ মিঃ সড়ক উন্নয়ন ॥ গত ১০ বছরে সড়ক উন্নয়নে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অভাবনীয় সফলতা অর্জন করে। ২১ হাজার কিঃ মিঃ সড়ক উন্নয়ন করে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। চলমান প্রকল্পসহ নানা প্রকল্প বাস্তবায়নে খরচ ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৮শ’ ২৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০১১ সাল থেকে ১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্রিজ, কালভার্ট, সড়ক সংস্কার, নির্মাণ খাতে ২শ’ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। এর মাধ্যমে ৮টি উপজেলার সঙ্গে জেলার সদর দফতরের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা হয়েছে। বর্তমানে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীভুক্ত প্রকল্প নবীনগর-শিবপুর-রাধিকা এবং নবীনগর-আশুগঞ্জ এর মাধ্যমে উপজেলা সদরের সঙ্গে বাঞ্ছারমপুর এবং নবীনগর উপজেলার সরাসরি যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার কাজ চলছে। জেলার সড়ক ও জনপথ বিভাগ টেন্ডার স্বচ্ছতা আনয়নেরও ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। অনলাইন টেন্ডার, বিল, রিপোর্ট সবটাতেই অনলাইন সিস্টেম চালুর মাধ্যমে সড়ক ও জনপথ বিভাগের কাজের স্বচ্ছতা আনয়নের প্রচেষ্টা চলছে। জিডিপি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে এ বিভাগ। ওয়েট লিমিট কন্ট্রোল ইউনিট নেই এখানে। এতে বিভিন্ন পণ্যবাহী ট্রাকগুলো দ্বিগুণ-তিনগুণ মালামাল বহন করছে। কোন কোন ট্রাক ২০ টনের স্থলে ৩০/৩৫ টন পর্যন্ত পণ্য বহন করছে। এসব কারণেই সড়কগুলো ভাঙ্গছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছে। এতে নির্মাণ ব্যয়ও বাড়ছে। আশুগঞ্জ নদীবন্দর হতে আখাউড়া স্থলবন্দর পর্যন্ত মোট ৫০.৫৮ কিঃ মিঃ রাস্তা লেনে উন্নীতকরণের মাধ্যমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়ক বিভাগের আওতাধীন ঢাকা-সিলেট জাতীয় মহাসড়কের প্রায় ১২ কিঃ মিঃ সড়কাংশ এবং কুমিল্লা-ময়নামতি-সরাইল সড়কের ২৭ কিঃ মিঃ সড়কাংশ ৪ লেনে উন্নীত হবে। প্রকল্পটিতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৫০০ কোটি টাকা। যার মধ্যে ভারত সরকার দেবে ২৫০০ কোটি টাকা। গত কয়েক দশকের মধ্যে সড়ক ও জনপথ বিভাগের এ কাজই সবচেয়ে বড় কাজ বলে কর্মকর্তারা দাবি করেছেন। প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে এতদাঞ্চলের জনগণের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটবে এবং দারিদ্র বিমোচনে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। পুনিয়াউট মোড় থেকে রামরাইল ব্রিজ পর্যন্ত সড়কটি ৩.৮ কিলোমিটার। এ সড়কাংশটুকু বর্তমানে বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্পভুক্ত হওয়ায় এর মাধ্যমে সড়কটি ৫. ৫ মিটার প্রশস্ততা থেকে ১০.৩৪ মিটার প্রশস্ততায় উন্নীত হবে।

কসবায় বিনা পয়সায় চাকরি পেল ২২শ’ লোক ॥ সীমান্তবর্তী উপজেলা কসবা। এক সময় কসবার সঙ্গে জেলা সদরের সরাসরি সড়ক ছিল খুবই কষ্ট সাধ্য। এখন সে অবস্থা কেটে গেছে। ঘণ্টার ব্যবধানেই চলাচল করা যায় কসবাতে। গত এক দশকে ১৪টি ছোট-বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে ৮শত ৩৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। কসবা-আখাউড়া উপজেলায় গরিব, দিনমজুর, অসহায় মানুষের বিনা পয়সায় চাকরি হয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী এ্যাডভোকেট আনিসুল হক নিজ এলাকার অন্তত ২২শ’ লোককে বিনে পয়সায় চাকরি দিয়েছেন।

মেঘনার তীরে সর্ববৃহৎ স্টিল রাইস সাইলো ॥ এখন থেকে উৎপাদিত বাড়তি খাদ্যশষ্য আর চট্রগ্রামে পাঠাতে হবে না। ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে রাখা যাবে উদ্ধৃত খাদ্যশষ্য। অন্তত ৫৪০ কোটিরও বেশি টাকা ব্যয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার মেঘনা নদীর তীরে সর্বাধুনিক এ স্টিল রাইস সাইলো নির্মাণ কাজ চলমান। গত বছরের এপ্রিলে সাইলোটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করে খাদ্য অধিদফতরের কাছে হস্তান্তর করার কথা ছিল। মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে নির্মাণ কাজ চলছে ধীরগতিতে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্মাণ কাজ শেষ হবে। এরপর ট্রায়াল রানের পর আগামী বছরের এপ্রিল অথবা মে মাস থেকে সাইলোটি পুরোপুরি চালু করা যাবে বলে প্রকল্প সংশ্লষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বদলে গেল নবীনগর ॥ বঞ্চিত উপজেলা নবীনগর। যোগাযোগ বাহন বলতে শুধু নৌকাই এ এলাকার বাসিন্দাদের একমাত্র অবলম্বন। নৌকা, লঞ্চ, স্পিডবোট দিয়ে চলাচল করত এখানকার মানুষজন। গোকর্ণ লঞ্চঘাট থেকে আড়াই ঘণ্টার পথ নবীনগর লঞ্চঘাট। যুগের পর যুগ ধরে এভাবেই চলছে, চলে আসছে। এসব যেন এখন শুধুই স্মৃতি। সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নবীনগরের সঙ্গে। আওয়ামী লীগ সরকারের গত ১০ বছর ধরে এ জনপথে চলছে উন্নয়নের মহাযজ্ঞ। উপজেলা সদর নবীনগরের সঙ্গে জেলা সদরের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার শেষ সীমানায় রসুলপুরে ১শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে তিতাস নদীর ওপর নির্মিত হয়েছে ঢাউস আকৃতির সেতু। এ সেতু এখন উন্নয়নের সোপান। সেতু ব্যবহার করে সরাসরি নবীনগরও যাওয়া যায়।

প্রাথমিক শিক্ষাক্ষেত্রেও ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। এর মধ্যে ১টি অফিস ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ১শ’ ৩৮টি বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়। পুঃনির্মাণ করা হয় ৫৭টি বিদ্যালয়। মেরামত করা হয় ৭শ’ ১৩টি বিদ্যালয়ের। ১শ’ ৩০টি বিদ্যালয়ের ওয়াস ব্লক নির্মাণ করা হয়। ১শ’ ৭৪ টি বিদ্যালয়ের নলকূপ স্থাপন করা হয়। ২শ’ ২১টি বিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু কর্নার ও মুক্তিযোদ্ধা কর্নার নির্মাণ করা হয়। ২শ’ ২১টি বিদ্যালয়ে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রপাতি নির্মাণ করা হয়। ১শ’ ৭৫টি বিদ্যালয়ে মাল্টি মিডিয়া স্থাপন করা হয়। সে সঙ্গে ১শ’ ৭৯টি বিদ্যালয়ে ল্যাপটপ প্রদান করা হয়। মাল্টি মিডিয়া ও ল্যাপটপ দেয়া হয় ১শ’ ৭০টি বিদ্যালয়ে। শেখ রাসেল ডিজিটাল ক্লাশরুম স্থাপন করা হয় একটি বিদ্যালয়ে। ৩৬টি বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়। ২শ’ ২১টি বিদ্যালয়ে মিড ডে মিল চালু করা হয়। অন্যদিকে ২শ’ ১৯টি বিদ্যালয়ে বিদ্যুত সংযোগ স্থাপন করা হয়।

নদীবেষ্ঠিত বাঞ্চারামপুরের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা ॥ বদ্বীপ খ্যাত উপজেলা বাঞ্ছারামপুর। চারদিকে খাল-বিল-নদী-নালাবেষ্ঠিত। এ উপজেলার সঙ্গে জেলা সদরের কোন যোগাযোগ ছিল না এক দশক আগে। ভরসা একমাত্র জলপথ। জলপথে জেলা সদরে আসতে সময় লাগত প্রায় সাড়ে ৪ ঘণ্টা। আর উপজেলা সদরের সঙ্গে গ্রামগুলোর তেমন কোন যোগাযোগ ছিল না। বর্তমান সরকারের সময় এ উপজেলার সঙ্গে জেলা সদরের সরাসরি যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গত ২০১০-২০২০ পর্যন্ত মোট ১০ বছরে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে।

রফতানি আয় বেড়েছে ॥ দেশের অন্যতম বৃহত্তম স্থলবন্দর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া দিয়ে রফতানি আয় বেড়েছে প্রায় দেড় শ’ কোটি টাকা।

২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরের এক হিসাব থেকে এ তথ্য জানা গেছে। হিসাব থেকে দেখা যায়, গত তিন মাস ধরে বাংলাদেশী পণ্য চাহিদা বেড়ে কোন মাসে আগের অর্থবছরের তুলনায় চার গুণে গিয়ে দাঁড়ায়। সর্বশেষ জুন মাসেও ছিল প্রায় দেড়গুণ। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা বলছেন, ত্রিপুরা ও এর আশপাশের রাজ্যগুলোতে বাংলাদেশের নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর চাহিদা বেড়ে যায়। বিশেষ করে মাছের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় রফতানি ও আয়ে প্রভাব পড়ে।

ব্যবসায়ীরা আরও জানান, এ বন্দর দিয়ে মাছের পাশাপাশি নিত্য প্রয়োজনীয় প্লাস্টিক সামগ্রী, জুস, নির্মাণ সামগ্রী রফতানি হয়। তবে ভারত থেকে আসে শুধু শুঁটকি আর আদা। তবে স্বাভাবিক সময়ে ১৫-২০ ধরনের পণ্য রফতানি হতো। বন্দরটি মূলত রফতানিনির্ভর।

আখাউড়া স্থল শুল্কস্টেশন থেকে প্রাপ্ত এক তথ্যে জানা গেছে, ২০২১-২০২১ অর্থবছরে এ বন্দর দিয়ে রফতানি হয়েছে ৬শ’ ৯৭ কোটি ৭০ লাখ এক হাজার ৭৫৮ টাকার পণ্য। এর আগের অর্থবছরে রফতানি হয় ৫৪২ কোটি ১৩ লাখ ২৯ হাজার ৯৩০ টাকা। যা সর্বশেষ অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১শ’ ৫০ কোটি টাকা কম।

সূত্র মতে, সর্বশেষ অর্থবছরে আমদানি হয় ১ কোটি ৯ লাখ ৯২ হাজার ২১৮ টাকার পণ্য। ২০১৯-২০ অর্থবছরে আমদানি হয় ১ কোটি ১৭ লাখ চার হাজার ৬৩৯ টাকার পণ্য। সর্বশেষ অর্থবছরে রাজস্ব আয় ৩২ লাখ ৬৮ হাজার ১৯৮ টাকা ও এর আগের বছর রাজস্ব আয় হয় ৪০ লাখ ৪৯ হাজার ৮০৫ টাকা।

দুই অর্থবছরের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত তিনমাস ধরে রফতানি বেশ বেড়েছে। সর্বশেষ অর্থবছরের এপ্রিল মাসে প্রায় ৪৭ লাখ টাকা, মে মাসে প্রায় ৫৩ কোটি টাকা ও জুন মাসে প্রায় ৩৮ কোটি টাকার পণ্য রফতানি হয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরের এপ্রিল মাসে প্রায় ১১ কোটি টাকা, মে মাসে প্রায় ২৩ কোটি টাকা ও জুন মাসে প্রায় ২৫ কোটি টাকার পণ্য রফতানি হয়। সর্বশেষ অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি গত ডিসেম্বর মাসে প্রায় ৯০ কোটি টাকার পণ্য রফতানি হয়। এর আগের অর্থবছরে একই মাসে ৮৫ কোটি টাকার পণ্য রফতানি হয়। আখাউড়া স্থলবন্দর আমদানি-রফতানিকারক এ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোঃ শফিকুল ইসলামও স্বীকার করেন নানা করণেই রফতানি আয় বেড়েছে।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা আল মামুন সরকার চলমান উন্নয়ন কাজ সম্বন্ধে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ২০৪১ সালের ভিশন পরিকল্পনা বাস্তবানের অংশ হিসেবেই জেলাজুড়ে সার্বিক উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনা করছেন। তাই জেলায় এ যাবতকালের সবচেয়ে বড় বড় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন চলছে। উন্নয়নের এই ধারা অব্যাহত রাখতে সকলের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সার্বিক উন্নয়ন কর্মকান্ড প্রসঙ্গে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী এ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে এবং দেশের উন্নয়ন বজায় রাখতেই জেলাজুড়ে এসব কর্মকা- চলছে। আগামীতে উন্নয়ন কর্মকান্ড আরও জোরদার করা হবে। তিনি উন্নয়ন কর্মকান্ড বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সহযোগিতা করার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানান।

দৈনিক গোপালগঞ্জ
দৈনিক গোপালগঞ্জ