• শনিবার   ২৩ অক্টোবর ২০২১ ||

  • কার্তিক ৮ ১৪২৮

  • || ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

দৈনিক গোপালগঞ্জ

কোটালীপাড়ায় করোনায় মৃত শিপ্রার সৎকারে এগিযে আশে নাই স্বজনেরা

দৈনিক গোপালগঞ্জ

প্রকাশিত: ৩১ জুলাই ২০২১  

এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছোটাছুটি করেও বাচাঁতে পারলেন না স্ত্রীকে, সৎকারে এগিয়ে এলো না প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনেরা। অবশেষে লাশের সৎকার করলো টিম লাইফ সাপোর্টের সদস্যরা। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২ টা। শিপ্রা রানী বৈদ্যর লাশ পড়ে আছে বাড়ির আঙ্গিনায়। মৃত্যু শিপ্রার  বাড়িতে নেই আত্মীয়, পাড়া-প্রতিবেশীদের ভীড়। একদিকে স্বজন হারানোর বেদনা অন্যদিকে কেউ এগিয়ে না আসায় মৃত শিপ্রার পরিবারের সদস্যরা হয়ে পড়ে বাকরুদ্ধ। অবশেষে টিম লাইফ সাপোর্টের সদস্যেদের সহায়তায় মধ্যরাতে লাশের সৎকার করে মৃতের পরিবারের সদস্যেরা।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে ঘটনাটি ঘটেছে গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার কলাবাড়ী ইউনিয়নের বুরুয়া গ্রামে। মৃতের স্বামী অসিম বৈদ্য নবধারা কে বলেন, সপ্তাহখানেক ধরে শরীরে জ্বর নিয়েই স্বাভাবিক কাজকর্ম করছিল স্ত্রী  শিপ্রা বৈদ্য  (৪০)। দুই দিন পর  প্রচন্ড কাশি শুরু হলে স্থানীয় পল্লী চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসা নেওয়ার পর কোন উন্নতি না ঘটায় ২৭ জুলাই ভর্তি করা হয় কোটালীপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। ওইদিনই রাপিট এন্টিজেন টেষ্টের মা্ধ্যমে করোনা পরীক্ষায় ফলাফল নেগেটিভ আসে। ২৮ জুলাই সকালে অবস্থার আরো অবনতি ঘটলে স্ত্রীর উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডেকেলে নিয়ে যাওয়া হয়। করোনা সার্টিফিকেট না থাকায় সেখানে ভর্তি না করলে নেওয়া হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয়ে সেখান থেকেও ফিরিয়ে দেওয়া হয়। নিয়ে যাওয়া হয় মিটফোর্ট হাসপাতালে। সেখানে অনেক আকুতি মিনতির পর ভর্তি করলেও শরীর নিস্তেজ ও মারাত্মক অবনতি ঘটায় সকালে রেফার্ড করা হয় ঢাকা মেডিকেলে সেখানে গেলে বলা হয় রোগী অক্সিজেন পাবে না এই শর্তে ভর্তি করতে পারেন। পরে ঢাকা থেকে নিয়ে এসে ভর্তি করা হয় গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যা হাসপাতালে। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল সন্ধ্যা ৬ টায় মারা যায়।

তিনি আরো বলেন, মৃত স্ত্রীকে রাত ৮ টায় বাড়িতে নিয়ে আসলে করোনা সন্দেহে কেউ এগিয়ে আসে নি। গ্রামের সমাজপতির কাছে গেলে তিনি বলেন, যেহেতু তার করোনা উপসর্গ ছিলো তাই পরিবারের সদস্যেদেরই সৎকারের ব্যবস্থা করতে হবে। এলকাবসীর এই কথায় আমরা মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ি। রাত সাড়ে ১১ টায় জানতে পারি টিম লাইফ সাপোর্ট করোনা রোগীদের নিয়ে কাজ করে। এসময় টিম লাইফ সাপোর্টের কলাবাড়ী ইউনিয়ন টিম লিডার সুশান্ত বর্ণিককে ফোনে বিষয়টি জানালে ২০ মিনিটের মধ্যে আমাদের বাড়িতে ছুটে আসেন তারা। টিমের আরেক সদস্যকে নিয়ে তারা সৎকারের যাবতীয় ব্যবস্থা করেন।

এ ব্যাপারে গ্রামের সমাজপতি ক্ষিতিশ দত্ত  বলেন, যেহেতু অসিম বৈদ্যের স্ত্রী হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে যেখানে করোনা রোগীরারা ছিলো তাই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য তাদেরকে পারিবারিকভাবে সৎকারের নির্দেশনা দেই তাছাড়া এলাকাবাসীও কেউ ওই বাড়িতে যেতে রাজি হচ্ছিল না। পরে জেনেছি টিম লাইফ সাপোর্টের সদস্যেরা সৎকারের ব্যবস্থা করে।

ইউপি সদস্য মনোরঞ্জন বালা বলেন, আমি অসুস্থ থাকায় যেতে পারি নাই। তবে শুনেছি টিম লাইফ সাপোর্টের সদস্য সুশান্ত বর্ণিক ও নকুল বালা সৎকারের ব্যবস্থা করেছে।

টিম লাইফ সাপোর্টের কলাবাড়ী ইউনিয়ন টিম লিডার সুশান্ত বর্ণিক নবধারা কে বলেন, রাত সাড়ে ১১ টার সময় জানতে পারি বুরুয়া গ্রামের শিপ্রা বৈদ্য নামের এক মহিলা গোপালগঞ্জ হাসপাতালে সন্ধ্যায় মারা যায়। গ্রামের লোকেরা করোনা সন্দেহে কেউ মৃতের বাড়িতে আসছে না। লাশ বাহিরে পড়ে আছে। সৎকারের ব্যবস্থা করতে পারছে না পরিবারের সদস্যরা। টিম লাইফ সাপোর্টের সহায়তা চায় মৃতের পরিবার। আমার অন্য সদস্যদের ফোনে না পেলে নিজেই সুরক্ষা সামগ্রী পরে ও নকুল বালা নামের এক ব্যক্তিকে তাৎক্ষনিক টিমের সদস্য বানিয়ে সুরক্ষা সামগ্রী পড়িয়ে ছুটে যাই মৃতের বাড়িতে। গিয়ে দেখি লাশ বাড়ির উঠানে পড়ে আছে। আমাদের দেখে ভরসা পায় মৃতের স্বামী অসিম বৈদ্যসহ পরিবারের সদস্যরা। তখন নিজ হাতে আমরা বাঁশ কেটে প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করে সৎকারের ব্যবস্থা করি পরিবারের সদস্যেদের নিয়ে। সব কাজ শেষ করতে রাত ৪ টা বেজে যায়।

এদিকে এমন মানবিক ঘটনায় কোটালীপাড়ায় ব্যপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।

দৈনিক গোপালগঞ্জ
দৈনিক গোপালগঞ্জ