ব্রেকিং:
ফরিদপুরে যুবদল নেতা গ্রেফতার গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার ‘বি’ ইউনিটের ফল প্রকাশ মাদারীপুরে সাপের ছোবলে বিজিবি সদস্যের মৃত্যু নয়াপল্টনে পুলিশের ওপর বিএনপি নেতাকর্মীদের হামলা, গ্রেফতার ৪৪ হবিগঞ্জের মাধবপুরে দুই ট্রাকের সংঘর্ষ, নিহত ২
  • বুধবার   ২৭ অক্টোবর ২০২১ ||

  • কার্তিক ১২ ১৪২৮

  • || ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

দৈনিক গোপালগঞ্জ

উদ্ধার হওয়া ৪০ কোটি টাকার দু’টি ড্রেজার ডুবেছে রূপসা নদীতে

দৈনিক গোপালগঞ্জ

প্রকাশিত: ৫ অক্টোবর ২০২১  

উদ্ধার হওয়া ৪০ কোটি টাকা মূল্যের ড্রেজার দু’টি রহস্যজনক কারনে ডুবে গেছে রূপসা নদীতে। এর আগে ড্রেজার দু’টি উদ্ধার করে পাউবো খুলনার ড্রেজার বিভাগ। ড্রেজার দু’টি ব্যবহারের ভাড়াবাবদ চার কোটি ২৫ লাখ ৬৮ হাজার টাকা আদায়ের জন্য মামলা দায়ের করেছে সংস্থাটি।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে হাওলাদার কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী মোঃ মেহেদী হাসান মুনকে। তিনি গোপালগঞ্জ জেলার কোটালিপাড়া থানা ছাত্রলীগের সভাপতি। 
সার্টিফিকেট মামলা করাসহ ড্রেজার দু’টি উদ্ধারের বিষয়ে পাউবোর আইনজীবী সমর চন্দ্র মণ্ডল স্বীকার করেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের খুলনা ড্রেজার বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়ের করা মামলার বিবরনে জানা গেছে মের্সাস হাওলাদার কনস্ট্রাকশন ১২০ দক্ষিণ মুগদাপাড়া, বাসাবো, ঢাকা ১২১৩ সাইট অফিস কোটালীপাড়া পৌরসভা, গোপলগঞ্জ জেলার ঘাগর নদ খননের জন্য ২০১৬ সালে পাউবোর মহাপরিচালক বরাবর এসডি কপোতাক্ষ ১৮ ইঞ্চি ও এসডি ভদ্রা ১২ ইঞ্চি ডায়া কাটার সাকশন ড্রেজার দু’টি লিজ/ভাড়ার জন্য আবেদন করে। ২০১৬ সালের ১৬ অক্টোবর আবেদনের পর কোনো চুক্তিপত্র ছাড়াই ১৫ দিনের মাথায় ৩০ অক্টোবর ড্রেজার পরিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কে এম নুরুল ইসলামের দপ্তরাদেশে ড্রেজার দু’টি হওলাদার কনস্ট্রাকশনকে সব মালামালসহ অবিলম্বে হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়। এই দপ্তরাদেশের পর কোনো চুক্তিপত্র ছাড়াই হাওলাদার কনস্ট্রাকশন নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে সব মালামালসহ ড্রেজার দু’টি খুলনা থেকে গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ায় নিয়ে যায়। চুক্তিপত্র এবং প্রথম কিস্তি পরিশোধ করার জন্য বারবার অনুরোধ করা হলেও হাওলাদার কনস্ট্রাকশন তা করেনি। পরবর্তী সময়ে প্রধান প্রকৌশলী শামছুদ্দিন আহমেদ যোগদানের পর তিনি কৌশলে ড্রেজার গ্রহনের ১০ মাস পর ড্রেজার ভাড়ার চুক্তি ২০১৭ সালের ১ আগস্ট স্বাক্ষর করান। চুক্তিপত্রে এস ডি কপোতাক্ষ বছরে (ভ্যাট সহ) দুই কোটি ৭৯ লাখ ৮২ হাজার ৮০ টাকা পাইপ ভাড়া ৬৪ হাজার ৫১২ টাকা এবং এস ডি ভদ্রার ভাড়া বাবদ ৭৯ লাখ ২৮ হাজার ২৫৬ টাকা ও পাইপ ভাড়া ৬২ হাজার ৫১২ টাকা নির্ধারণ করা হয়। চুক্তিপত্রের ১৪ নং ধারা অনুসারে চুক্তিপত্রের অষ্টম দিন হতে ভাড়া কার্যকর করার কথা নিশ্চিত করা হয় । ড্রেজার সচল/অচল/ মেরামতাধীন যে অবস্থাতেই থাকুক না কেন, ত্রৈমাসিক হিসেবে তিন মাস পর পর ভাড়া প্রদানে শর্ত থাকলেও বাস্তবে বছর পার হয়ে গেলেও তার কোনো কিছুই পালন করা হয়নি।
২০১৮ সালে ৩ জানুয়ারি একটি টিভি চ্যানেলে এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশের পর নড়ে চড়ে বসে কর্তৃপক্ষ। সেই প্রতিবেদনে বলা হয় সরেজমিন কোটালিপাড়ায় ড্রেজার দেখতে গিয়ে দেখা যায় ড্রেজার দু’টির নাম বদল করে ফেলা হয়েছে এবং স্থানীয় ভাবে প্রচারিত ছিল যে উপজেলা চেয়ারম্যান এই ড্রেজার দু’টি ক্রয় করেছেন। পাউবোর নিয়োগকৃত ড্রেজারের কর্মরত সব কর্মীদের বেতনভাতা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দেওয়ার কথা থাকলেও তারা কিছুই প্রদান করেনি। ফলে কর্মীদের বেতন-ভাতা বাবদ পাউবোর গচ্ছা গেছে কয়েক কোটি টাকা।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর হতেই ড্রেজার বিভাগ ড্রেজার দু’টি উদ্ধারের জন্য তৎপরতা শুরু করে। পত্র আদান-প্রদান, নোটিশ নানাবিধ ভাবে এবং সর্বশেষ ড্রেজার দু’টি গ্রহনের জন্য দু’টি ট্যাগবোর্ড খুলনা থেকে কোঠালিপাড়ায় পাঠানো হয়। সেই ট্যাগবোর্ড দু’টি প্রায় ১৫ দিন সেখানে অবস্থানের পর স্থানীয় প্রশাসনের সহয়তায় ১৬ আগস্ট ২০১৮ ড্রেজার দু’টি খুলনায় আনা হয়।
নির্বাহী প্রকৌশৈলীর দপ্তর হতে হাওলাদার কনস্ট্রাকশনের কাছে ড্রেজার দু’টি ১৫ মাস ১৫ দিন ব্যবহারের ভাড়া বাবদ মোট চার কোটি ৬৬ লাখ ৩৪ হাজার ২২৪ টাকার দাবিনামা পেশ করা হয়। এই ভাড়ার টাকা বিপরীতে জামানত হিসেবে দেওয়া ৪০ লাখ ৬৫ হাজার ৬৬৪ টাকা সমন্বয় করা পর মোট বকেয়া থাকে চার কোটি ২৫ লাখ ৬৮ হাজার ৫৫৯ টাকা। তবে এই ভাড়ায় চুক্তিপত্র আগের ১০ মাসের ভাড়ার কোনো হিসাব দেখানো হয়নি।
এ ব্যাপারে মেসার্স হাওলাদার কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারি ও উপজেলার ছাত্রলীগের সভাপতি মেহেদী হাসান মুনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি ড্রেজার বিভাগে ভাড়া দাবির কথা স্বীকার করেন। তিনি আরও বলেন, ভাড়ার ব্যাপারে ডিজি মহোদয়ের কাছে তারা আবেদন করেছেন। তবে এ বিষয়ে তার বাবা কোটালিপাড়ার সাবেক উপজেলার চেয়ারম্যান মুজিবর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। তিনি নিজে এখনও কোটালীপাড়া ছাত্রলীগের সভাপতি বলে দাবি করেন। তিনিও পাউবোর মামলা দায়েরের কথা স্বীকার করেন।
সাবেক উপজেলার চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমানের মুঠোফোনে যোগায্গো করলে তিনি পাউবোর খুলনা ড্রেজার বিভাগের চার কোটি ২৫ লাখ টাকা ভাড়া জন্য মামলা দায়ের করার কথা জানেন বলে স্বীকার করেন। তিনি জানান, তারা যখন ড্রেজার ফেরত নিয়ে গেছে তখন তাকে লিখিত দিয়ে গেছে। তিনি পাউবোর ডিজি, প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি ড্রেজার মেরামত করতে অনেক টাকা ব্যয় করেছেন। তিনি আরও জানান, এ ব্যাপারে দুদক খুলনা অফিসও তদন্ত শুরু করেছিল।
খুলনা পাউবোর ড্রেজার বিভাগ, খুলনার নির্বাহী প্রকৌশৈলী মোঃ গোলাম নবী জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাদের যেভাবে নির্দেশনা দেন, তারা সেভাবেই কাজ করেন। বলেন হাওলাদার কনস্ট্রাকশনের কাছে চার কোটি ২৫ লাখ টাকা ড্রেজার ভাড়া আদায়ের জন্য সার্টিফিকেট মামলা করা হয়েছে পাউবোর নির্দেশনা অনুযায়ী। করোনার জন্য দীর্ঘদিন বিরতির পর গত ২৮ সেপ্টেম্বর মামলার তারিখ নির্ধারিত ছিল, কিন্তু বিবাদী পক্ষের আবেদনে শেষ সময় দেওয়া হয়েছে।
ড্রেজার বিভাগের আইনজীবী এড. সমর চন্দ্র মণ্ডল স্বীকার করেন, বিভিন্ন মিডিয়ার সংবাদ ড্রেজার দু’টি উদ্ধার করতে সহায়ক হয়েছে। তিনি বলেন, ড্রেজার ভাড়ার দাবিনামার লিগ্যাল নোটিশকে হাওলাদার কনস্ট্রাকশন কোনো গুরুত্ব দেয়নি। আদালতে ভাড়া দেওয়ার কথা স্বীকার করে শুধু সময়ক্ষেপণ করছে। তবে এবার আদালত শেষ সময় দিয়েছে ২৮ অক্টোবর, ২০২১।
এদিকে খুলনার লবণচরাস্থ ড্রেজার বিভাগের অফিসে গিয়ে দেখা যায়, কোটালিপাড়া হতে ফেরত আনা ড্রেজার দু’টি রহস্যজনক কারনে রূপসা নদীতে ডুবে রয়েছে। জোয়ারে সময় কিছু অংশ দেখা যায়। 
ড্রেজার বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ গোলাম নবী বলেন, ড্রেজার দু’টির তলা ফেটে যাওয়ায় ডুবে গেছে। তিনি এই ড্রেজার দু’টি কোনো যত্রাংশ খুলে অন্য ড্রেজারের লাগনোর কথা অস্বীকার করেন। 
তবে ড্রেজার বিভাগের কর্মীদের লিখিত অভিযোগে জানা গেছে, অন্য ড্রেজারের জন্য যন্ত্রাংশ ক্রয়ের টেন্ডার দেখিয়ে এই দু’টি ড্রেজার থেকে তা খুলে সরবরাহ করা হয়েছে। আর এরফলে কোটি টাকা লোপাট করা করেছে সংশ্লিষ্টরা। এ জন্য তদন্তের দাবি করেছেন তারা।

দৈনিক গোপালগঞ্জ
দৈনিক গোপালগঞ্জ