• মঙ্গলবার   ২৫ জানুয়ারি ২০২২ ||

  • মাঘ ১২ ১৪২৮

  • || ২১ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

দৈনিক গোপালগঞ্জ

নেতৃত্বের বিকাশে সহায়ক গুণাবলি

দৈনিক গোপালগঞ্জ

প্রকাশিত: ২৯ নভেম্বর ২০২১  

সঠিক নেতৃত্ব একটি সমাজ ও রাষ্ট্রের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। আবার ভুল নেতৃত্ব পুরো জাতির জন্য দুর্ভাগ্যের কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই ইসলামে নেতৃত্বের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছে। ইসলামের নিদের্শনা হলো নেতৃত্ব সঠিক ব্যক্তির হাতে তুলে দিতে হবে এবং কোনো ব্যক্তি যদি নেতৃত্ব লাভ করে তবে তার অপূর্ণতাগুলো দূর করবে।

নেতৃত্ব গ্রহণে ইসলামের নির্দেশনা

নেতৃত্ব গ্রহণ ও বর্জনের ব্যাপারে ইসলামের তিনটি মৌলিক নির্দেশনা দিয়েছে। তা হলো,  ১. কোনো ব্যক্তি নেতৃত্ব চেয়ে নেবে না : বরং নেতৃত্বের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করবে। আবু মুসা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ও আমার গোত্রের দুই ব্যক্তি নবী (সা.)-এর কাছে এলাম। সে দুজনের একজন বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে আমির নিযুক্ত করুন। অন্যজনও অনুরূপ কথা বলল। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যারা নেতৃত্ব চায় এবং এর লোভ করে, আমরা তাদের এ পদে নিয়োগ করি না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭১৪৯)

২. যোগ্য ব্যক্তির হাতে নেতৃত্ব অর্পণ : ইসলাম ব্যক্তিকে নেতৃত্ব চেয়ে নিতে নিষেধ করেছে। কিন্তু যাঁরা সমাজের নেতৃত্ব নির্ধারণ করেন তাঁদের নির্দেশ দিয়েছে যেন তারা যোগ্য ব্যক্তির হাতে নেতৃত্ব অর্পণ করে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নবী বলল, আল্লাহ অবশ্যই তাকে তোমাদের জন্য মনোনীত করেছেন এবং তিনি তাকে জ্ঞানে ও দেহে সমৃদ্ধ করেছেন। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা স্বীয় রাজত্ব দান করেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৪৭)

৩. সমাজের প্রয়োজনে নেতৃত্ব গ্রহণ : জাতির দুর্দিনে নেতৃত্বের জন্য এগিয়ে আসা নিন্দনীয় নয়; বরং ক্ষেত্রবিশেষ তা প্রশংসনীয়ও বটে। বিশেষত যখন নেতৃত্ব দেওয়ার মতো বিকল্প কোনো ব্যক্তি পাওয়া না যায়। মিসরের সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষ থেকে জাতি রক্ষা করতে ইউসুফ (আ.) মিসর শাসককে বলেছিলেন, ‘আমাকে দেশের ধন-ভাণ্ডারের কর্তৃত্ব প্রদান করেন। নিশ্চয়ই আমি উত্তম রক্ষক, সুবিজ্ঞ।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত : ৫৫)

নেতৃত্বের বিকাশে সহায়ক গুণাবলি

কোরআন ও হাদিসে মুমিনদের এমন কিছু বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারে উৎসাহিত করা হয়েছে, যা নেতৃত্বের বিকাশে সহায়ক। নিম্নে এমন সাতটি গুণ ও বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হলো—

১. ইতিবাচক আচরণ : নেতৃত্ব বিকাশে মানুষের ইতিবাচক আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম মন্দ ব্যবহারের পরিবর্তেও ভালো ব্যবহারের নির্দেশ দেয়। ইরশাদ হয়েছে, ‘মন্দ প্রতিহত কোরো উত্কৃষ্ট দ্বারা; ফলে তোমার সঙ্গে যার শত্রুতা আছে সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো।’ (সুরা হা-মিম-সাজদা, আয়াত : ৩৪)

২. দায়িত্বের প্রতি সচেতন থাকা : দায়িত্ব সচেতনতাই একজন ব্যক্তির নেতৃত্বকে দৃঢ় করে এবং তাকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫২০০)

৩. সহমর্মী হওয়া : একজন নেতা সমাজের সব মানুষের প্রতি সহমর্মী হবে। অন্যের বিপদ ও দুর্দিনে পাশে থাকবে। নবীজি (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের পার্থিব কোনো বিপদ দূর করে আল্লাহ পরকালে তার বিপদ দূর করবেন। যে ব্যক্তি পৃথিবীতে অন্যের অভাব দূর করবে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার অভাব দূর করবেন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১৯৩০)

৪. পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও স্নেহ : বয়স, পদমর্যাদা ও সামাজিক অবস্থানের বিবেচনা করে নেতা মানুষের সঙ্গে স্নেহ ও শ্রদ্ধার সম্পর্ক বজায় রাখবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের ছোটদের প্রতি স্নেহ করে না, আমাদের বড়দের সম্মান দিতে জানে না, সে আমার উম্মতভুক্ত নয়।’ (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৪৯৪৩)

অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘দ্বিন কল্যাণকামিতার নাম।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১৯২৬)

৫. অভিজ্ঞদের দ্বারা উপকৃত হওয়া : একজন নেতার দ্বারা সব কাজ একা সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। তাই তার উচিত হলো অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের দ্বারা উপকৃত হবে। তাদের দেখে নিজের ভুল শুধরে নেবে। নবীজি (সা.) বলেন, ‘পদে পদে বাধাপ্রাপ্ত ব্যক্তিই সহনশীল ও ধৈর্যশীল হয় এবং অভিজ্ঞতা ছাড়া বিচক্ষণ ও প্রজ্ঞাবান হওয়া যায় না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২০৩৩)

৬. জনকল্যাণে কাজ করা : ইসলামী বিধান মতে কোনো সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বের মূলভিত্তি কল্যাণকামিতা। মাকিল (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘কোনো বান্দাকে যদি আল্লাহ জনগণের নেতৃত্ব প্রদান করেন এবং সে কল্যাণকামিতার সঙ্গে তাদের তত্ত্বাবধান না করে, তবে সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭১৫১)

৭. পরামর্শের ভিত্তিতে কাজ করা : সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় ইসলাম পরামর্শের ভিত্তিতে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে। কেননা ব্যক্তি যখন পরামর্শের ভিত্তিতে কাজ করে তখন আল্লাহ সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করেন এবং ব্যক্তিকে ভুল-ত্রুটির দায় থেকে মুক্ত রাখেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা নিজেদের মধ্যে পরামর্শের মাধ্যমে নিজেদের কাজ সম্পাদন করে এবং তাদের আমি যে জীবিকা দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে।’ (সুরা আশ-শুরা, আয়াত : ৩৮)

অবহেলা লজ্জার কারণ হয়

নেতৃত্ব লাভের পর যদি কোনো ব্যক্তি তার দায়িত্ব পালনে অবহেলা করে, তবে তা পরকালে তার লজ্জার কারণ হতে পারে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমরা নেতৃত্বের লোভ করো, অথচ কিয়ামতের দিন তা লজ্জার কারণ হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭১৪৮)

দৈনিক গোপালগঞ্জ
দৈনিক গোপালগঞ্জ