• শুক্রবার   ২০ মে ২০২২ ||

  • জ্যৈষ্ঠ ৬ ১৪২৯

  • || ১৯ শাওয়াল ১৪৪৩

দৈনিক গোপালগঞ্জ

রাজনীতির পাঠশালা: মধুর রেস্তোরাঁ, ইতিহাস সৃষ্টিতে সদা তৎপর

দৈনিক গোপালগঞ্জ

প্রকাশিত: ২৯ মার্চ ২০২২  

ইতিহাসের শাখা প্রশাখার মত বিস্তার হচ্ছে মধুর রেস্তোরাঁ। দিন যায়, মাস যায়, নতুন বছর আসে মধুর রেস্তোরাঁ, মধুর রেস্তোরাঁই থেকে যায়। কিন্তু পুরোনো সাদা-কালো ঘটনার কালের স্বাক্ষী কাঁধে বহন করে ইতিহাস হয়ে থাকলেও এ রেস্তোরাঁ, নতুন ইতিহাস জন্ম দিতেও সদা তৎপর।

রাজনৈতিক বোদ্ধারা কখনও বা কখনও এসেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ মধুর রেস্তোরাঁতে। মধু নেই তো কি হয়েছে, মধুর রেস্তোরাঁ তো আছে। রাজনীতি থেকে এমন কোন নীতি নেই যে মধুর রেস্তোরাঁ তে আলোচনা হয় না। প্রবীণ রাজনীতিবিদরা মনে করে ‘মধুর রেস্তোরাঁ’ রাজনীতির পাঠশালাও বটে। রাজনীতির হাতেখড়ি শেখার জন্য এক উত্তম স্থান।

মধুসূদন দে ও তাঁর রেস্তোরাঁ সামাজিক ও রাজনৈতিক মুক্তিযুদ্ধের পূর্ববর্তী নানা আন্দোলনে ছিল সংশ্লিষ্টতা ও পদচারণা। চক্ষুশূল হয়ে পড়েন ব্যক্তি মধু ও তাঁর রেস্তোরাঁ, যার মূল্য মধু’কে দিতে হয় ২৫ মার্চ, ১৯৭১ সালের সেই বর্বর কালরাতে। হানাদার বাহিনী তাঁকে জগন্নাথ হল থেকে তুলে নিয়ে যায় এবং নিঃসংশভাবে হত্যা করে সবার প্রিয় মধু’কে গুড়িয়ে দেয় তাঁর রেস্তোরাঁটিও।

মধুদা স্মৃতি সংসদ প্রকাশনী’র উদ্যোগে প্রকাশিত হয় “মধুদা: শহীদ মধু সূদন দে স্মারক গ্রন্থ” বইটি। এতে শিক্ষা এবং সংস্কৃতি ব্যক্তিত্বদের অনেকেই মধুদাকে নিয়ে তাদের স্মৃতির কথা লিখেছেন। বইটির ভূমিকায় বাংলা সাহিত্যের ইমেরিটাস অধ্যাপক প্রয়াত আনিসুজ্জামান লিখেছেন “একদিকে শিক্ষার্থীদের জন্য মধুর ভালবাসা আর অন্যদিকে মধুর প্রতি শিক্ষার্থীদের শ্রদ্ধা- এসব কিছু পাকিস্তানিদের কাছে মধুকে সন্দেহভাজন করে তুলেছিল।

ব্যবসায়িক লেনদেনের মাঝে এত চমৎকার স্নেহ আর সম্প্রীতির সম্পর্ক কীভাবে গড়ে উঠতে পারে? এখানে অবশ্যই সন্দেহজনক কিছু চলছে। মধুর ব্যতিক্রমধর্মী ব্যক্তিত্বই যে ছাত্র-ছাত্রীদের ভরসার কারণ হয়ে উঠেছিল এসব কিছুই শত্রুদের বোধগম্যতায় আসে নি।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আদিত্যের রেস্তোরাঁ যেভাবে হয়ে উঠল মধুর রেস্তোরাঁ: বিক্রমপুরের শ্রীনগরের জমিদারদের সাথে নকরী চন্দ্র তথা মধুসূদন দে’র পিতামহের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সেই সুবাদে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে নকরী চন্দ্রের দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে আদিত্য চন্দ্রের ওপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ব্যবসা প্রসারের দায়িত্ব পড়ে।

নকরী চন্দ্রের মৃত্যুর পর আদিত্য চন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাসের মাধ্যমে তার ব্যবসা শুরু করেন। ব্রিটিশ পুলিশ এ সময় ক্যাম্পাসের আশাপাশের ব্যারাক ও ক্যাম্প প্রত্যাহার করার উদ্যোগ নেয়। আদিত্য চন্দ্র ব্রিটিশ পুলিশের কাছ থেকে ৩০ টাকার বিনিময়ে দুটি ছনের ঘর ক্রয় করে বসবাস শুরু করেন। তৈরি হল ‘আদিত্যের ক্যান্টিন’।

মধুর বয়স তখন ১৫ বছর। তিনি ১৯৩৪-৩৫ সাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার পিতার সাথে খাবারের ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৩৯ সালে পক্ষাঘাতে পিতার মৃত্যুর পর মধুদা নিজেই ধরেন ব্যবসার হাল।

ইতিহাস বলছে, মধুদার ক্যান্টিন যেখানে, আগে ঠিক সেখানেই ছিল নবাব আহসানউল্লাহের নাচঘর। ১৮৪৮ থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত ঢাকার নবাব ছিলেন আহসানউল্লাহ। নবাবের তিনটি বাগানবাড়ির মধ্যে একটি ছিল শাহবাগে। শোনা যায়, শাহবাগের বাগানবাড়ির নাচঘরেই নাকি পরে তৈরি হয় মধু’দার ক্যান্টিন। কেউ কেউ বলেন, নাচঘর নয়, সেখানে ছিল নবাবের বাগান বাড়ির বৈঠকখানা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের দাবির প্রেক্ষিতে ডাকসু কার্যক্রম শুরু হয়। আর কলা ভবনের পাশে মধুদার দায়িত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় মধুর রেস্তোরাঁ।

রেস্তোরাঁ যখন হয়ে উঠে রাজনীতির পাঠশালা: ১৯৩৯ সালের পর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতির আঁতুড়ঘর এই ‘মধুর ক্যান্টিন’। দেশের অধিকাংশ জাদরেল ও তাবড় রাজনীতিবিদদের হাতেখড়ি এই ক্যান্টিনে।

দেশভাগের পর ১৯৪৯ এর বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের আন্দোলন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচন, ১৯৬৯ থেকে, ১৯৭১ পর্যন্ত বহু মিটিং হয়েছে এই ক্যান্টিনে। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত একাধিক ঘটনার সাক্ষী থেকেছেন মধুসূদন দে। হয়তো দেশের মুক্তিতে মধুসূদনের সমর্থন ছিল।

১৯৯৭ আহমদ ছফার ‘মধুদার স্মৃতি’ নামে এক প্রবন্ধের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। রাজনীতিতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান হয়ে উঠেছিল মধুর রেস্তোরাঁ। যেমনটা আহমদ ছফা তাঁর প্রবন্ধে লিখেছেন-

মধুদা ক্যান্টিনে সকালের দিকে বসতেন না। বাইরে নানা কাজে ঘোরাঘুরি করতেন। দুপুরে সময় পেলে একবার এসে ক্যাশে বসতেন। সময় না পেলে আসতেন একেবারে চারটের পর। এসেই কর্মচারীদের জিগ্যেস করতেন, আইজকা মোয়াজ্জেম সাব আইছিল? তাঁর লোকেরা বলত, হ। তিনি বললেন, লেখো বিশ কাপ চা। জাফর সাব? হ। লেখো বিশ কাপ। এমনি করে যে সমস্ত ছাত্রনেতা মধুর ক্যান্টিনে বসে রাজনৈতিক কাজকর্ম চালিয়ে যেতেন, তারা কে কয় কাপ চা খেতেন, মধুদা বলবেন কি তারা নিজেরাও বলতে পারতেন না। অতএব মধুদা অনুমান করে এক একটা সংখ্যা বসিয়ে দিতেন। যেমন মোয়াজ্জেম সাব বিশ কাপ, ফরমান উল্লাহ পনেরো কাপ। চায়ের কাপের অঙ্কটা তো মধুদা বসাতেন। টাকাটা আদায় হত কি না আমার সন্দেহ।”

অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম লিখেছেন, “মধুর ক্যান্টিনে তিনটি বড় টেবিল ছিল যেখানে প্রায় ৩০ জন বসতে পারত। এই তিনটি টেবিল অলিখিতভাবেই ঘোষিত ছিল তৎকালীন বিচক্ষণ ছাত্র নেতাদের জন্য। সকাল থেকে সন্ধ্যা আইন বিভাগের সেই ছাত্রদের দখলেই টেবিলগুলো থাকত। দেশ বিভাগের আগে আমি সেখানে বিখ্যাত বামপন্থী নেতাদেরকেও দেখেছি যাদের মধ্যে ছিলেন এস. এম. আলী এবং মুনির চৌধুরী।”

তিনি আরও লিখেছেন, “১৯৪৮ এর ১১ মার্চ এবং ১৯৫২ এর ২১ ফেব্রুয়ারির কার্যক্রমের সকল পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতি এই মধুর ক্যান্টিনে বসেই নেওয়া হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই পুলিশ এবং ইপিআর বাহিনীর চোখে পড়ে যান মধু। এদের আক্রমণে বহুবার মধুর ক্যান্টিনে ধ্বংসযজ্ঞ চলেছে।”

কেমন দেখতে ছিল সবার প্রিয় মধুদা: ‘মধুদার স্মৃতি’ প্রবন্ধের ভূমিকায় সলিমুল্লাহ খান মধুদা’র কিছুটা বর্ণনা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। ‘মধুদার গায়ের রঙ্গ ধবধবে শাদা হইলেও দেখাইত একটু তামাটে। মহাদেবের মত চেহারা হইলেও তাঁহার মুখের জবান ছিল আদি এবং অকৃত্রিম ঢাকাইয়া।’

নিহত মধুদা: ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ, মধুদা তৎকালীন ছাত্রনেতা রাশেদ খান মেনন’কে একটি ডিম ভেজে খাইয়ে বলেছিলেন, “দাদা পরিস্থিতি ভাল না। নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান।” মেনন এবং অন্যরা নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারলেন, কিন্তু মধুদা গেলেন শিববাড়িস্থ কোয়ার্টারে। ২৬ মার্চ মধুদার বাসায় গিয়ে পাক সেনারা তাঁর স্ত্রী, পুত্র আর পুত্রবধূকে হত্যা করে আর মধুদাকে তুলে নিয়ে যায় জগন্নাথ হলের মাঠে। সেখানে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড় করানো হয় তাঁকে। গুলিতে লুটিয়ে পড়ে তাঁর দেহ। মধুদাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে নিহত সবার সাথে সেখানেই গণকবরে সমাহিত করা হয়। মৃত্যুর সময় ৫৫ বছর বয়সী মধুসূদনের ছিল ১১ সন্তান।

আজকের মধুর ক্যান্টিন: হত্যা শুধু মধুকেই না, হানাদার বাহিনীরা দুমড়ে-মুচড়ে দেয় তাঁর ক্যান্টিনও। সেই ভগ্নস্তূপেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সংস্কার করে মধুদার রেস্তোরাঁটি। শুরুতে এটি মধুর স্টল, মধুর টি-স্টল, মধুর রেস্তোরা ইত্যাদি নামেও পরিচিত থাকলেও বাংলা ১৩৭৯ সালের ২০ বৈশাখ ডাকসুর উদ্যোগে এর নামকরণ করা হয় ‘মধুর রেস্তোরা’।

মধুদার স্মরণে মধুর ক্যান্টিন প্রাঙ্গনেই নির্মিত হয় তার স্মৃতি ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটির গায়ে লেখা রয়েছে ‘আমাদের প্রিয় মধুদা’ । এর ভাস্কর হলেন মো. তৌফিক হোসেন খান। ১৯৯৫ সালের ১৮ এপ্রিল তৎকালীন উপাচার্য এমাজ উদ্দীন আহমেদ ভাস্কর্যটি উদ্বোধন করেন। তবে পরবর্তীতে এটি পুনঃনির্মাণ করা হয় এবং ২০০১ সালের ১৭ মার্চ পুনঃনির্মিত ভাস্কর্যের উদ্বোধন করেন উপাচার্য এ. কে আজাদ চৌধুরী।

সেই স্বাধীনতার পর থেকে মধুসূদনের দ্বিতীয় পুত্র অরুণকুমার দে মাত্র এগারো বছর বয়সে ক্যান্টিনের দায়িত্ব তুলে নেন নিজ কাঁধে। এখন অবধি কাঁধে করে নিয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি।

শেষ কিছু কথা: মধু নেই তবে তাঁর উপস্থিতি রয়েছে। রয়েছে ক্যান্টিন, যেখানে দু পেয়ালা চায়ের আসরে জমে উঠে রাজনীতির নানা পঠন-পাঠন। বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক নেতাদের মাঝে, একটি কথা বরং বারই শোনা যায়, “রাজনীতি শিখতে হলে মধুতে এসো।” মধুর রেস্তোরাঁ এভাবে এক ভরসা, নির্ভরতা জায়গা হয়ে উঠছে রাজনীতি শিখতে চাওয়াদের কাছে।

নতুন নতুন রাজনৈতিক বোদ্ধা তৈরিতে সদা তৎপর এ রেস্তোরাঁ। এ রেস্তোরাঁ যে ইতিহাস হয়ে গিয়েছে, তা জীবদ্দশাতেই মধুসূদন বুঝতে পেরেছিলেন। ইতিহাসের শেষ আছে, তবে মধুর রেস্তোরাঁ কিংবা এ ক্যান্টিনের ইতিহাসের শেষ নেয়। প্রতিনিয়ত নতুন ইতিহাস, নতুন ঘটনা জন্ম দেয়ার জন্য প্রস্তুত এ রেস্তোরাঁ। হয়তো ইতিহাসের শাখা প্রশাখার মত নতুন ইতিহাস বিস্তারের মধ্যে বেড়ে উঠবে মধুর রেস্তোরাঁ ; যে বেড়ে উঠা সীমাহীন।

দৈনিক গোপালগঞ্জ
দৈনিক গোপালগঞ্জ