• বৃহস্পতিবার ২৫ জুলাই ২০২৪ ||

  • শ্রাবণ ৯ ১৪৩১

  • || ১৭ মুহররম ১৪৪৬

দৈনিক গোপালগঞ্জ

সবার হাতে বই তুলে দিতে হেঁটে চলেছেন এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রাম

দৈনিক গোপালগঞ্জ

প্রকাশিত: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৩  

কাঁধে ঝোলানো ব্যাগভর্তি বই, পরনে পুরনো কাপড়, গলায় পেঁচানো মাফলার, লাঠিতে ভর করে গ্রামের পথ ধরে হেঁটে চলেছেন এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রাম। না, কিছু বিক্রি করতে নয়, সবার হাতে বই তুলে দিতে তার এই যাত্রা। ১০ বছর ধরে প্রতিদিনই এভাবে কাঁধে ঝোলাভর্তি বই নিয়ে হেঁটে মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে বই বিলি করছেন কোনো স্বার্থ ছাড়াই। তার একটাই চাওয়া বই পড়ে যেন সকলে একটু জ্ঞান লাভ করে। তাই তো এলাকাবাসী তার নাম দিয়েছে জ্ঞানের ফেরিওয়ালা। 

বলছিলাম গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়া উপজেলার কলাবাড়ী ইউনিয়নের কুমরিয়া গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক সুনীল কুমার গাঙ্গুলীর কথা। ৭৫ বছর বয়সে এসেও প্রতিদিন কাঁধে ঝোলাভর্তি বই নিয়ে গ্রামে গ্রামে হেঁটে বই পৌঁছে দেন বিভিন্ন বয়সী পাঠকের হাতে। আবার আগের দেওয়া বইটি পাঠকের কাছ থেকে ফেরত নিয়ে আসছেন নিজে গিয়ে। বৃদ্ধাদের দেন ধর্মের বই, শিক্ষার্থীদের দেন মনিষীদের বই, ছোটদের দেন গল্পের বই। এছাড়াও অজপাড়াগাঁয়ে নিজ বাড়ির আঙিনায় ছোট পরিসরে ছয়শত বই নিয়ে গড়ে তুলেছেন পাঠাগার। সেই পাঠাগারেও প্রতিদিন বই পড়তে আসছে অসংখ্য পাঠক। পাঠাগারে বইয়ের তালিকার কোন পছন্দের বই যদি পাঠক পড়তে চান সেটিও তিনি পৌঁছে দেন পাঠকের বাড়ি গিয়ে। পড়াশেষ হলে আবার নিজে গিয়ে ফেরত নিয়ে আসেন।

ADVERTISEMENT


জানা যায়, ছেলেবেলা থেকেই বই পড়ার প্রতি প্রচুর আগ্রহ ছিল সুনীল গাঙ্গুলীর। কিন্তু বই কেনার ও পড়ার সামর্থ্য ছিল না। বাড়ির পাশে এক চাচাতো ভাইয়ের কাছ থেকে বই ধার করে পড়তেন। কিন্তু পরের কাছ থেকে বই ধার করে পড়ে তার মনের খোরাক মেটাতে পারতেন না। তখনই তিনি ঠিক করেছিলেন, কোনদিন সামর্থ্য হলে একটি পাঠাগার করবেন। সেই পাঠাগারের বই নিজে পড়বেন, অন্যকেও পড়তে দেবেন। তার সেই সামর্থ্য অবশেষে হলো চাকরি থেকে অবসরের পরে। পেনশনের টাকায় পাঠাগারের জন্য বই কিনলেন। সেসব বই তিনি কাঁধে করে মানুষের দ্বারে গিয়ে বিলি করেন।

dhakapost

আরও জানা যায়, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ছিলেন সুনীল গাঙ্গুলী। ২০১৫ সালে অবসরে যান। অবসরে যাওয়ার আগের বছর ২০১৪ সালে নিজ বাড়ির আঙিনায় পুত্রবধূর নামে গড়ে তোলেন চন্দ্রিকা জ্ঞান পাঠাগার নামে একটি পাঠাগার। তার এই পাঠাগারে ছয় শতাধিক বই আছে। পাঠাগার তৈরির আগে থেকেই স্বল্প পরিসরে বই সংগ্রহ করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করতেন তিনি।

সোমবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) এই জ্ঞানের ফেরিওয়ালার সঙ্গে কথা হয়। এ সময় তিনি জানান নানা জানা অজানা গল্প।

শেষ বয়সে আপনি এই অজপাড়াগাঁয় একটি পাঠাগার তৈরি করলেন, সেই পাঠাগারের বই আবার নিজে গিয়ে পাঠকের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। এখান থেকে আপনার চাওয়া কী?

সুনীল গাঙ্গুলী: ছোটবেলা থেকেই আমার বই পড়ার প্রচুর আগ্রহ ছিল। কিন্তু গরিব পরিবারে জন্ম হওয়ায় আমার বই কেনার সামর্থ্য ছিল না। বাড়ির পাশে এক চাচাতো ভাইয়ের কাছ থেকে বই ধার করে পড়তাম। তাতে আর মনের খোড়াক মিটতো না। তখন থেকেই আশা ছিল টাকা-পয়সা হলে বাড়িতে একটা পাঠাগার দেব। আর আমার জন্মই অজপাড়াগাঁয়, বড় হয়েছি কুসংস্কার ও দারিদ্র্যতার মধ্য দিয়ে। এই কুসংস্কার ও দারিদ্র্যতা থেকে বের হতে আমাদেরকে জ্ঞান অর্জন করতে হবে। তাহলে বের হওয়া সম্ভব। তার জন্য বই পড়তে হবে। এ কারণেই পাঠাগারটি গড়ে তোলা। এখান থেকে যেন একটু হলেও মানুষ জ্ঞান অর্জন করতে পারে। জ্ঞানপিপাসু মানুষের হাতে বই তুলে দিতে চাই। পিছিয়ে পড়া এই জনপদকে সামনে এগিয়ে নিতে চাই। এটাই আমার চাওয়া।

পাঠাগারে বইয়ের সংখ্যা কত? পাঠক কোন ধরনের বই পড়তে আগ্রহ বেশি? পুত্রবধূর নামে পাঠাগারের নামকরণ কেন করলেন?

সুনীল গাঙ্গুলি: ২০১৪ সালে চাকরি থেকে অবসরে যাই। ওই বছরই বাড়ির আঙিনায় আড়াইশ বই নিয়ে একটি পাঠাগার গড়ে তুলি। প্রথমে পাঠকের উপস্থিতি অনেক কম ছিল। আমি পেশায় একজন শিক্ষক ছিলাম কোনো বাড়িতে গেলে সবাই আমাকে ভালোবাসতেন সম্মান করতেন। গ্রামের লোকজন আমার মুখে গল্প শুনতে ভালোবাসতেন। ২০১৫ সাল থেকে ব্যাগে করে পাঠাগার থেকে বই নিয়ে গিয়ে সবাইকে পড়তে উদ্বুদ্ধ করতাম। এক্ষেত্রে একটু কৌশল অবলম্বন করতাম, যেমন- বৃদ্ধাদের দিতাম ধর্মের বই, শিক্ষার্থীদের দিতাম মনিষীদের উক্তির বই, ছোটদের দিতাম গল্পের বই। একটি বই দিয়ে বলতাম ‘বইটা পড়েন। আমি আগামী সপ্তাহে এসে জেনে যাব, কেমন লাগলো এবং নিয়ে যা। পরের সপ্তাহে বইটা পড়া শেষ হলে অন্য বই দিয়ে আসতাম। আস্তে আস্তে পাঠকের সংখ্যা বাড়তে থাকলো তখন আরও কিছু বই কিনলাম। সব মিলিয়ে এখন বইয়ের সংখ্যা সাড়ে ছয়শ। এখন পাঠকের বই পড়ার প্রতি আগ্রহ অনেক বেড়েছে।

আর পুত্রবধূর নামে করার কারণ হচ্ছে, আমার একটি মাত্র ছেলে। কোন মেয়ে নেই ছেলেকে বিয়ে দিয়েছি। বৌ মা খুব ভালো মানুষ। আমাকে একদম বাবার মতো সেবাযত্ন করে।  আমার বয়স হয়েছে আমি তো আর বেশি দিন বাঁচব না। আমি মারা গেলে আমার নাতি-নাতনিরা  যাতে তার মায়ের প্রতি ভালোবাসায় পাঠাগারটি আগলে রাখে, সে জন্যই তার নামে পাঠাগারটি করেছি।

হেঁটে হেঁটে এতো পথ পাড়ি দেন এই বৃদ্ধ বয়সে। কষ্ট হয় না?

সুনিল গাঙ্গুলি: ছোটবেলা থেকেই আমরা কর্মজীবী মানুষতো তাই বসে থাকতে পারি না। হাঁটলে ভালোই লাগে। আবার বয়স হয়েছে একটু তো কষ্ট হয়। কিন্তু যখন একজন পাঠক একটি  বই পড়ে বলে  খুব ভালো লেগেছে তখন আর কষ্ট থাকে না।

এবিষয়ে সুনীল গাঙ্গুলির সাবেক সহকর্মী অবসর প্রাপ্ত শিক্ষক সমেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলী বলেন, আমাদের এই অজপাড়াগাঁয়ের মানুষের মধ্যে তিনি জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন। নিঃস্বার্থভাবে মানুষের মধ্যে বই বিলি করে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন তিনি। পিছিয়ে পড়া এ জনগোষ্ঠীকে সামনে এগিয়ে নিতে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। তিনি আমাদের জ্ঞানের ফেরিওয়ালা।

কুমরিয়া গ্রমের এক শিক্ষার্থী বলেন, প্রতি সপ্তাহে দাদু আমাদের নতুন বই দিয়ে যান আর পুরান বইটি নিয়ে যান। পাঠাগারের বইয়ের তালিকা দেখে পছন্দের বই নাম বলে দেই তিনি পৌঁছে দিয়ে যান। আমরা এই বইয়ের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করতে পারছি।

কলাবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিজন বিশ্বাস বলেন, তিনি প্রশংসার দাবি রাখেন। এই অজপাড়াগাঁয়ের মানুষের মধ্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি আমাদের জ্ঞানের ফেরিওয়ালা।

দৈনিক গোপালগঞ্জ
দৈনিক গোপালগঞ্জ