• সোমবার ১৭ জুন ২০২৪ ||

  • আষাঢ় ৩ ১৪৩১

  • || ০৯ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৫

দৈনিক গোপালগঞ্জ

শেখ হাসিনার আঁচলে মায়ের গন্ধ!

দৈনিক গোপালগঞ্জ

প্রকাশিত: ১৮ মে ২০২৪  

মায়ের শরীরের গন্ধ জন্মের পর থেকেই চিনে নেয় শিশু, এই গন্ধের সাথে নাড়ির টান রয়েছে। সেই শৈশব থেকেই মনে হয় সেই গন্ধটা মানুষের মস্তিস্কে ঢুকে যায়।

এটা হলো মায়ের গন্ধ। প্রত্যেকটা মানুষের শরীরে আলাদা আলাদা গন্ধ থাকে। শারীরিক এই সুবাস বা গন্ধের কারণে মস্তিষ্কের নিউরনের প্রতিটি কোষ সক্রিয় হয়ে ওঠে। এ পদ্ধতি বেশি কার্যকর থাকে শিশুদের মধ্যে। সুইডিশ গবেষকদের তথ্য মতে, যখন একটি শিশু জন্মগ্রহণ করে তখন তার মধ্যে প্রাকৃতিকভাবেই সবচেয়ে বেশি শারীরিক গন্ধ বা সুবাস নেওয়ার শক্তি বেশি থাকে। যে ঘ্রাণশক্তি দিয়েই শিশু তার মাকে সহজে চিনে নিতে পারে। সুইডিশ গবেষকরা আরও বলছে, শরীরের এ গন্ধ শুধু পরিবারকেই কাছে টেনে নেয় না বরং একই রকমের মানসিক অবস্থার মানুষকেও আকর্ষণ করে।
আমার মায়ের শরীরে একটা অদ্ভুত সুন্দর গন্ধ আছে। মায়ের শাড়ি উঠোনের রোদে শুকাতে দেওয়া থাকলেও আমি বারবার গিয়ে সেই শাড়ির আঁচলে মুখ মুছতাম কিংবা নাকে মুখে কিছুক্ষণ জড়িয়ে রাখতাম। এই গন্ধটা আমার মস্তিস্কে ঢুকে গেছে। আমি যখনই মায়ের কথা ভাবি, তখনই মায়ের শরীরের এই ঘ্রাণ পাই। আমি এই গন্ধ পেলেই শৈশব, কৈশোরে ফিরে যাই। এই গন্ধ আমি অন্য কোথাও পাই না।

পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগেই আমার বিয়ে হয়ে যায়। আমি স্বামীর হাত ধরে চলে আসি সাভারে। এক কামরার ফ্ল্যাটে আমাদের নতুন সংসার। সকাল হলেই সে বের হয়ে যায় অফিসের উদ্দেশ্যে। সারাদিন আমি বাসায় একা থাকি। নতুন বউ, তার মধ্যে পারাপ্রতিবেশি কাউকে চিনি না। আমি বাসায় তালা দিয়ে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াই। একদিন ঘুরতে ঘুরতে চলে গেলাম সাভারের সিআরপিতে। তখন বিকেল চারটা। গিয়ে দেখলাম এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। সিআরপির বাস্কেটবলের মাঠে অনেকগুলো হুইল চেয়ারে বসে রোগীরা বাস্কেট বল খেলছে। তাদেরকে সহযোগিতা করছে কিছু তরুণ বিদেশি, পাড়াগাঁয়ে বড় হয়ে ওঠা আমি এতো হুইল চেয়ার, এতো ফিজিক্যাল চ্যালেঞ্জড মানুষ কখনো একসাথে দেখিনি। কখনো চলতে পথে কোনো ফিজিক্যাল চ্যালেঞ্জড মানুষকে দেখে থাকলেও তাদেরকে ভীষণ অসুখী মনে হয়েছে। কিন্তু এখানে তো হুইল চেয়ারে বসা সকলেই খুব সুখী, খুব আনন্দের সাথে তারা বাস্কেটবল খেলছে। আমার মনে হয় এই জায়গায় যেভাবেই হোক আমার কাজ করতেই হবে। আমি খোঁজ নিতে থাকি এখানে কি কি উপায়ে কাজ পাওয়া যেতে পারে। জানতে পারলাম, এখানে ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করা যায়। চাইলে আমি স্বেছায় রোগীদের সাথে কাজ করতে পারবো। কয়েকদিন পরে আমি মাস্টার্সে ভর্তি হয়ে চলে যাই ময়মনসিংহে। সেখানে দুবছর থেকে মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়ে আবার ফিরে আসি সাভারে। ফিরে আসার দুইদিন পরেই আমাদের দোতালার ভাবী আমাকে একটি সার্কুলারের কপি দিয়ে যায়। দেখি উইলিয়াম অ্যান্ড মেরি টেইলর স্কুলে শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি এটি। উইলিয়াম অ্যান্ড মেরি টেইলর স্কুল হলো সিআরপির ইনক্লুসিভ স্কুল। এখানে সুস্থ এবং ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড ছেলে মেয়েরা একসাথে পড়াশুনা করে। সিআরপিতে কাজ করার সুপ্ত বাসনাটি সেই মুহূর্তে আবার নতুন করে জেগে ওঠে। আমি খুব সাধারণ একটি বায়োডাটা তৈরি করে সাথে একাডেমিক কাগজপত্র নিয়ে দুদিন পরে চলে গেলাম ইন্টারভিউ দিতে। গিয়ে দেখি অনেক মানুষ পরীক্ষা দিতে এসেছে। লিখিত পরীক্ষা হলো, এরপর বিকেলে মৌখিক সাক্ষাৎকার হলো। সাক্ষাৎকার শেষে আমি বাসায় ফিরে এলাম। চাকরিটা আমি পেয়ে গেলাম। খুব আনন্দের সাথে আমি শিশুদের নিয়ে কাজ করতে লাগলাম। এটা ২০০২ সালের ঘটনা। জয়েন করার পরের মাস থেকে আমি বিকেলে কলেজেও ক্লাস নেওয়া শুরু করি। ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল টেকনোলজি এবং নার্সিং কলেজে ক্লাশ নিতাম খুব আনন্দের সাথে।

২০০৫ সালে আমরা একদিন জানতে পারলাম শেখ হাসিনা আসবেন সিআরপিতে, তার আদরের দুই নাতনীর জন্মদিনের উৎসব পালন করবেন আমাদের সাথে। শেখ হাসিনা বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। ২০০৫ সালে তিনি বিরোধীদলীয় নেত্রী ছিলেন। আমরা খুব আনন্দ নিয়ে আয়োজন শুরু করলাম। সিআরপি’র প্রতিষ্ঠাতা ভ্যালরি টেইলরের দুজন কন্যা সন্তান আছে। দুইজন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুকে দত্তক নিয়ে তিনি কন্যা পরিচয় দিয়েছেন। বড় মেয়ে জ্যোতি আর ছোট মেয়ে পপি। যেদিন শেখ হাসিনা আসবেন আমি পপিকে হুইল চেয়ারে করে নিয়ে সিআরপির সদর দরজায় দাঁড়িয়ে রইলাম তাকে স্বাগত জানাবো বলে। বেশিক্ষণ দাঁড়াতে হলো না আমাদের। ঠিক সময়েই শেখ হাসিনা তার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল এবং দুই নাতনিকে নিয়ে গাড়ি থেকে নামলেন। পপি ফুল দিয়ে তাদেরকে বরণ করে নিলো, আমি পপিকে সাহায্য করছিলাম। শেখ হাসিনা কি অবলীলায় পপিকে জড়িয়ে ধরলেন। পপির মুখ থেকে তখন লালা ঝরছিল। তিনি নিজের আঁচল দিয়ে পপির লালা মুছিয়ে দিলেন। আমি একটু এগিয়ে যেতেই আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন, বেশ কিছুটা সময় আমায় বুকে জড়িয়ে ধরে কানের কাছে বললেন, তুমি একটা খুব ভালো কাজ করছো এই মেয়েটাকে চলতে সাহায্য করে। আমি বহুদিন পরে মায়ের শরীরের সেই সৌরভ পেলাম সেদিন। একেবারে মায়ের গন্ধ, যে গন্ধ আমার মস্তিস্কের নিউরনে সবসময় সঞ্চিত থাকে সে গন্ধ চিনতে আমার কখনো ভুল হতে পারে না। সেই ছবিটা আমার মনের ভেতরে গেঁথে রইলো, ক্যামেরাবন্দী করা হয়নি। তখন তো স্মার্ট ফোন ছিল না। কোনো ক্যামেরাম্যানের ক্যামেরায় ধারন করা হলেও আমার সংগ্রহে নেই সেই পার্থিব ছবি। আমি যেখানে ধারন করে রেখেছি সেখান থেকে হারিয়ে যাবে না আমার জীবদ্দশায়। এখনও যখন আমি আমার মস্তিস্কের নিউরন থেকে সেই পরিচিত গন্ধ পেতে চেষ্টা করি একই সাথে আমার মায়ের মুখ এবং শেখ হাসিনার মুখ আমার মানসপটে ভেসে ওঠে। প্রধানমন্ত্রীত্বের আড়ালে কত সন্তানের মনে এমন করেই মা হয়ে বেঁচে আছেন তিনি।

লেখক: ফ্রিল্যান্সার

দৈনিক গোপালগঞ্জ
দৈনিক গোপালগঞ্জ