• সোমবার ১৭ জুন ২০২৪ ||

  • আষাঢ় ৩ ১৪৩১

  • || ০৯ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৫

দৈনিক গোপালগঞ্জ

নতুন শিক্ষাক্রমে শিক্ষার্থীদের আচরণও মূল্যায়ন করা হবে

দৈনিক গোপালগঞ্জ

প্রকাশিত: ২৯ মে ২০২৪  

নতুন শিক্ষাক্রমে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতা ও পারদর্শিতার পাশাপাশি আচরণগত দিক মূল্যায়নের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। স্বাভাবিক মূল্যায়নের মতো এ মূল্যায়নেও সাতটি স্তর বা সূচক থাকবে। রিপোর্ট কার্ডে ‘আচরণিক ক্ষেত্র’ নামে আলাদা একটি ছক থাকবে। বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে এই মূল্যায়ন করবেন শিক্ষকেরা। 

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) তৈরি করা ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম ২০২২ এর মূল্যায়ন কৌশল ও বাস্তবায়ন নির্দেশনা’ সংক্রান্ত প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা যায়।

এনসিটিবি সূত্র জানায়, প্রতিবেদনটি গতকাল মঙ্গলবার কারিকুলাম ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রিভিশন কোর কমিটিতে পাস হয়েছে। এখন তা এনসিটিবির বোর্ড সভা হয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) সভায় চূড়ান্ত হবে।

‘আচরণ’ বলতে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর আচরণ, দলগত কাজে অংশগ্রহণ, আগ্রহ, সহযোগিতামূলক মনোভাব ইত্যাদি বিষয় বোঝানো হয়েছে। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকেরা শিখন কার্যক্রম চলার সময় এই আচরণগুলো পর্যবেক্ষণ করবেন। এরপর আচরণিক নির্দেশকসমূহে শিক্ষার্থীর অর্জনের মাত্রা নির্ধারিত হবে।

জানতে চাইলে এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক মো. মশিউজ্জামান বলেন, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত সংগ্রহ করা হচ্ছে। সব প্রক্রিয়া শেষে এনসিসিসি সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। সেখানে চূড়ান্ত হলে সবাইকে তা জানিয়ে দেওয়া হবে।

এনসিটিবির প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, আচরণিক নির্দেশকগুলোতে শিক্ষার্থীর অর্জনের মাত্রা বছরে দুবার শিক্ষকেরা ‘নৈপুণ্য অ্যাপ’-এর মাধ্যমে ইনপুট দেবেন। এর মধ্যে একবার ষাণ্মাসিক মূল্যায়নের সময়, আরেকবার বার্ষিক সামষ্টিক মূল্যায়নের সময়। এরপর শিক্ষার্থীর ১০টি বিষয়ের আচরণিক নির্দেশকের অর্জিত মাত্রা সমন্বয় করে চূড়ান্ত ট্রান্সক্রিপ্ট এবং রিপোর্ট কার্ড নৈপুণ্য অ্যাপের মাধ্যমে প্রণয়ন করা হবে।

শিক্ষার্থীদের আচরণ মূল্যায়নের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন শিক্ষাবিদেরা। তাঁরা বলছেন, এতে শিক্ষার্থীর আচরণ মানবিক ও সামাজিক হবে।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক অধ্যাপক সৈয়দা তাহমিনা আক্তার বলেন, এই উদ্যোগ অবশ্যই ভালো। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আচরণিক দিকগুলো চর্চা হলে এর প্রভাব শিক্ষার্থীর ওপর পড়বে। এতে শিক্ষার্থীর আচরণ অনেক বেশি মানবিক ও সামাজিক হবে।

গত বছর প্রথম, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন করা হয়। আর চলতি বছর বাস্তবায়ন করা হয় দ্বিতীয়, তৃতীয়, অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে। এরপর ২০২৫ সালে পঞ্চম ও দশম শ্রেণিতে, ২০২৬ সালে একাদশ এবং ২০২৭ সালে দ্বাদশ শ্রেণিতে এই শিক্ষাক্রম চালু হবে। 

নতুন শিক্ষাক্রম: এসএসসিতে ফেল করলেও একাদশে ভর্তি হওয়া যাবেনতুন শিক্ষাক্রম: এসএসসিতে ফেল করলেও একাদশে ভর্তি হওয়া যাবে
ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণিতে মোট ১০টি বিষয় রয়েছে। সেগুলো হলো বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান, ডিজিটাল প্রযুক্তি, জীবন ও জীবিকা, ধর্মশিক্ষা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, শিল্প ও সংস্কৃতি। 

সাত স্কেলে মূল্যায়ন
প্রতিটি বিষয়ে নির্ধারিত পারদর্শিতার (নৈপুণ্য) ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর অর্জন সাতটি স্কেল বা সূচকে মূল্যায়নের পর রিপোর্ট কার্ডে প্রকাশ করা হবে। সাতটি স্কেলের জন্য থাকবে সাতটি ছক। এতে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষক—সবাই শিক্ষার্থীর অবস্থান বুঝতে পারবেন। সাতটি স্কেল হলো অনন্য, অর্জনমুখী, অগ্রগামী, সক্রিয়, অনুসন্ধানী, বিকাশমান ও প্রারম্ভিক। সর্বোচ্চ স্কেল ‘অনন্য’ বলতে বোঝানো হবে, শিক্ষার্থী সব বিষয়ে পারদর্শিতার চূড়ান্ত স্তর অর্জন করেছে। আর ‘প্রারম্ভিক’ স্তর হলো সবচেয়ে নিচের স্তর।

৬৫ শতাংশ লিখিত, কার্যভিত্তিক ৩৫ শতাংশ প্রতি শ্রেণির (ষষ্ঠ থেকে দশম) লিখিত মূল্যায়নে ওয়েটেজ ৬৫ শতাংশ এবং কার্যক্রমভিত্তিক মূল্যায়নে ৩৫ শতাংশ ওয়েটেজ থাকবে। এখানে কার্যক্রম বলতে বোঝানো হচ্ছে, অ্যাসাইনমেন্ট করা, উপস্থাপন, অনুসন্ধান, প্রদর্শন, সমস্যার সমাধান করা, পরিকল্পনা প্রণয়ন ইত্যাদি।

এর আগে অবশ্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কমিটি লিখিত মূল্যায়নের ওয়েটেজ ৫০ শতাংশ আর কার্যক্রমভিত্তিক মূল্যায়নের ওয়েটেজ ৫০ শতাংশ রাখার সুপারিশ করেছিল। তবে ১৪ মে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় সেটিতে পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত হয়।

ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির মূল্যায়ন হবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, আর দশম শ্রেণি শেষে পাবলিক (এসএসসি) পরীক্ষা বা মূল্যায়ন শিক্ষা বোর্ডের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতি বিষয়ে ষাণ্মাসিক, বার্ষিক মূল্যায়ন এবং পাবলিক মূল্যায়নের নির্ধারিত সময়সীমা হবে এক কর্মদিবসে সর্বোচ্চ ৫ ঘণ্টা।

নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী অনুষ্ঠিত মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় এক বা দুই বিষয়ে অনুত্তীর্ণ হলেও শিক্ষার্থী শর্ত সাপেক্ষে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হতে পারবে। তবে শিক্ষার্থীকে পরের দুই বছরের মধ্যে পাবলিক মূল্যায়নে অংশগ্রহণ করে অনুত্তীর্ণ বিষয়গুলোতে উত্তীর্ণ হতে হবে। এছাড়া একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েও কোন শিক্ষার্থী মান উন্নয়নের জন্য এক বা একাধিক বিষয়ে পাবলিক মূল্যায়নে (এসএসসি) অংশ নিতে পারবে। 

ক্লাসে ৭০ শতাংশ উপস্থিত থাকতে হবে
একজন শিক্ষার্থী ক্লাসে ৭০ শতাংশ কর্মদিবস উপস্থিত না হলে পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হবে না বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় এ ক্ষেত্রে সব বিষয়ে শিক্ষকের সম্মিলিত আলোচনায় ছাড় দিতে পারবেন প্রধান শিক্ষক। দশম শ্রেণির পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্যও এ নিয়ম প্রযোজ্য হবে। একই সঙ্গে তিন বা তার বেশি বিষয়ে যদি কোনো শিক্ষার্থী বিকাশমান বা নিচের স্তরে থাকে, তাহলেও সে পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হতে পারবে না। 

তবে কোনো শিক্ষার্থী পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তরণের জন্য বিবেচিত না হলেও সব শিক্ষার্থী বছর শেষে পারদর্শিতার ভিত্তিতে ট্রান্সক্রিপ্ট পাবে। একই সঙ্গে ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির রিপোর্ট কার্ডে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকের মতামত দেওয়ার সুযোগ থাকবে।

মূল্যায়নে উপকরণ সরবরাহ
ষাণ্মাসিক ও বার্ষিক মূল্যায়নের জন্য খাতা এবং বিষয়ের চাহিদা অনুযায়ী পরীক্ষণ, মডেল তৈরি, নকশা, গ্রাফ ইত্যাদির জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আর দশম শ্রেণির পাঠ শেষে যে পাবলিক পরীক্ষা (এসএসসি) অনুষ্ঠিত হবে, তার উপকরণ সংশ্লিষ্ট পরীক্ষাকেন্দ্রে থাকবে।

দৈনিক গোপালগঞ্জ
দৈনিক গোপালগঞ্জ