• সোমবার   ০৬ ডিসেম্বর ২০২১ ||

  • অগ্রাহায়ণ ২২ ১৪২৮

  • || ০১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৩

দৈনিক গোপালগঞ্জ

ভুল পথে লাখো কিশোরী আশায় ঘর ছেড়ে বিভীষিকায় পা

দৈনিক গোপালগঞ্জ

প্রকাশিত: ৯ নভেম্বর ২০২১  

প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে মাধ্যমিকে পা রাখতেই বড় ধরনের ভুল করে বসছে বহু কিশোরী। কখনো প্রেমের টানে, কখনো নানা উচ্চাকাক্সক্ষায় ঘর ছাড়ছে তারা। এর একটি বড় অংশই শিকার হচ্ছে পাচারের। কাউকে কাউকে বাধ্য হয়ে চলতে হচ্ছে অন্ধকার পথে। কেউ কেউ ফিরছেনও-কিন্তু ততদিনে সর্বনাশের গল্প লেখা হয়ে গেছে ললাটে, হারিয়ে গেছে স্বপ্ন।

বয়ঃসন্ধিকালে থাকা এসব কিশোরী বা তরুণী নিরুদ্দেশ হওয়ার পরও লোকলজ্জা বা জানাজানির ভয়ে অভিভাবকদের বড় অংশ থানায় অভিযোগ বা ডায়েরি করেন না। যারা করেছেন, সে সংখ্যাটাও বাড়াচ্ছে উদ্বেগ। কয়েক মাসে শুধু রাজধানীর মিরপুর থেকে পাঁচ শতাধিক কিশোরী ও তরুণীর ‘নিখোঁজ’-এর তথ্য থানায় নথিভুক্ত (মিসিং ডায়েরি) হয়েছে।

পুলিশ জানায়, একেক থানায় শিশু থেকে তরুণী নিখোঁজের মামলার সংখ্যা মোট মামলার প্রায় ৩৫ শতাংশ। তবে সমাজে এমন ঘটনার মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ থানা পর্যন্ত আসছে। র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) তথ্য, ২০০৪ সাল থেকে চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত ৩৭৬ অভিযানে ১ হাজার ৫৮ নারী পাচারকারী বা তাদের হোতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতার হওয়া পাচারকারীদের তথ্যমতে, তাদের হাত হয়ে শত শত নারী-শিশু পাচার হয়েছে। উল্লিখিত সময়ে ১ হাজার ৮৫ নারী-শিশু উদ্ধার হয়েছে। মামলা হয়েছে ৪১৯টি। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া ও পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের প্রধান উপকমিশনার (ডিসি) মো. ফারুক হোসেন যুগান্তরকে বলেন, বিভিন্ন থানায় শিশু থেকে নারী মিসিং ডায়েরি করোনার সময়ে বেড়েছে। বিশেষ করে রাজধানীতে এ সংখ্যা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক। সম্প্রতি মিরপুর ডিভিশনের ৮ থানায় প্রায় ৫০০ মিসিং ডায়েরি হয়েছে, যাদের প্রায় সবাই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ুয়া ছিলেন। তাদের মধ্যে ১০০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।

কিশোরী ও তরুণীদের মধ্যে নিখোঁজের হার কেন বেশি? এ প্রশ্নে ফারুক হোসেন বলেন, লেখাপড়ার জন্য বাসায় অভিভাবকের চাপ; প্রতারক, পাচারকারী ও নিষিদ্ধপল্লির দালালদের খপ্পরে পড়া এবং ‘ভালো থাকা’র প্রলোভনে ঘর ছাড়ছে তারা। এমনকি উচ্চশিক্ষার প্রলোভনেও ঘর ছাড়তে দেখা গেছে। এক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি ভূমিকা রয়েছে। করোনার এ সময়ে ঘরে থেকে নানা কারণে বেশিমাত্রায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছে উঠতি বয়সিরা। প্রতারকচক্র এ সুযোগ নিয়ে নানা প্রলোভন দেখাচ্ছে। বিশেষ কিছুর আশায় ঘর ছেড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে তারা। আবার অনলাইনে চেনা কিন্তু প্রকৃত অর্থে অচেনা মানুষের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়েও ভুল পথ বেছে নিচ্ছে কিশোরী ও তরুণীরা। তিনি বলেন, এক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

মেয়েটি কেন ঘর ছাড়ল, এমন প্রশ্নে এক অভিভাবক বলেন, মেয়েটাকে বকা দিয়েছিলাম, নেট দুনিয়ায় কম থেকে পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে বলেছিলাম। আরেক অভিভাবক বলেন, মেয়েটা মূলত একটা বখাটে ছেলের সঙ্গে পালিয়ে গেছে। তিনি পুলিশকে অনুরোধ করেন, ‘মেয়ে ও ছেলেটিকে শুধু উদ্ধার করে দিন, পরে আমরা পারিবারিকভাবে বিয়ে দেব।’ মিসিং ডায়েরি করার পর গোল সিল মারা ‘রিসিভড’ কপি নিয়ে অপেক্ষায় থাকেন অভিভাবকরা। কিন্তু কমসংখ্যক অপেক্ষাই ফুরায়।

চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর পল্লবী থেকে কয়েকদিনে ৮ ছাত্রী নিরুদ্দেশ হয়। পাঁচ দিন পর তিন ছাত্রীকে উদ্ধার করে র‌্যাব। তারা সবাই বাসা থেকে টাকা, গয়না ও স্কুল সার্টিফিকেট নিয়ে বেরিয়েছিল। উচ্চ আকাক্সক্ষায় ভুল পথে বের হয়ে পাচারকারীদের কবলে পড়েছিল তারা। সম্প্রতি যশোর সীমান্ত দিয়ে পাচার হয়ে যাওয়া গাজীপুরের এক শিক্ষার্থীকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তার বড়বোনের বক্তব্য, এক প্রেমিকের হাত ধরে গত বছরের ডিসেম্বরে ঘর থেকে পালিয়ে যায়। এ বছরের আগস্টে পাচারের শিকার ৭৬ জনের সঙ্গে তার বোন দেশে ফিরে। তাকে অন্ধকার জগতে রাখা হয়েছিল। তিনবার ভ্রূণ ও বাচ্চা নষ্ট করা হয়।

ফিরে আসা কয়েকজন ও তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফেরার পর ঘরে-বাইরে ঘৃণার পাত্র হচ্ছে কিশোরী-তরুণীরা। অনেকে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার ট্রমায় ভুগছে। এক মা জানান, তার মেয়ে একটি ছেলের প্রেমের ফাঁদে পড়ে মধ্যরাতে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। লজ্জায় থানায় জানানো হয়নি। ২৩ দিন পরে মেয়ে নিজেই বাড়িতে ফেরে। ওই সময়টুকুতে যা সর্বনাশ হওয়ার, তা হয়ে যায়। পরে তার আর স্কুলে পড়া হয়নি। মানসিক সমস্যায় ভুগছে। বাধ্য হয়ে রাজধানী ছেড়ে গ্রামে চলে গেছেন।

মানবাধিকার সংস্থা ‘রাইটস যশোর’-এর তথ্য অনুযায়ী, ১০ বছরে শুধু ভারতে পাচার প্রায় তিন হাজার কিশোরী-তরুণীকে দেশে আনা হয়েছে। পাচার হওয়াদের মধ্যে মাত্র ১০ ভাগ উদ্ধার হয়। আর দেশের মধ্যে লুকিয়ে থাকা/রাখা তরুণীদের উদ্ধার সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হলেও ক্ষতিটা পোশানোর নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সমাজ-পরিবার তাকে ভিন্নচোখে দেখে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুল ইসলাম খান বলেন, উঠতি বয়সি তরুণীরাই এ ধরনের মারাত্মক ভুল বেশি করে। এজন্য অবশ্য অভিভাবকরাও দায়ী। সন্তান বড় হলে প্রয়োজনীয় নজরদারি বাড়াতে হয়, যা বর্তমান সমাজে অনুপস্থিত। এখানে সমাজেরও দায় রয়েছে। সমাজ কিশোরী-তরুণী-নারীদের জন্য আদর্শ ও নিরাপদ জায়গা তৈরি করতে পারেনি।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, পাচার হওয়া নারীদের ১০ শতাংশেরও কম উদ্ধার হচ্ছে। অধিকাংশ তরুণী নিজেই ভুল করে নিরুদ্দেশ হয়। মনে রাখতে হবে, হারিয়ে যাওয়া বা প্রেমে পালিয়ে যাওয়া (ভুল প্রেমিক) নারী অধিকাংশ পাচারের শিকার হয়। অনেকে আবার পরিবারে ফিরতে না পারায় নিজ দেশেই কুরে কুরে মরছে। নেট দুনিয়ায় প্রেমের ফাঁদ কিংবা চাকরির কথা বলে তাদের নেওয়া হলেও পরে অন্ধকার জগতে তাদের বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে।

দৈনিক গোপালগঞ্জ
দৈনিক গোপালগঞ্জ